মান্দায় দুই হাটের পৌনে ১৯ লাখ টাকার উন্নয়নকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ
নওগাঁর মান্দায় দুটি হাটের উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া প্রায় ১৯ লাখ টাকার কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, নামমাত্র কাজ দেখিয়ে প্রকল্পের পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। কোথাও বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ হয়নি, আবার কোথাও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সভাপতিরাও। তাঁদের অভিযোগ, শুধু কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট দুই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা প্রকৌশলী।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অনুন্নত হাটবাজার উন্নয়নের জন্য প্রাপ্ত ১০ শতাংশ তহবিল থেকে উপজেলার মৈনম ও কাঁশোপাড়া ইউনিয়নের দুটি হাটের উন্নয়নে ১৮ লাখ ৭১ হাজার ৭২৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দ ছিল ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬২ টাকা।
গত ৯ জুলাই উপজেলা হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় মৈনম ইউনিয়নে চারটি এবং কাঁশোপাড়া ইউনিয়নে পাঁচটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।অনুমোদিত প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, মৈনম হাটে স্ট্রিট লাইট মেরামত ও স্থাপনে ৩ লাখ টাকা, দুটি সেড নির্মাণে ৬ লাখ টাকা এবং অভ্যন্তরীণ নালা ও আবর্জনা পরিষ্কারে ৩৫ হাজার ৮৬২ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।অন্যদিকে কাঁশোপাড়া ইউনিয়নের সিংগীহাটে টয়লেট ও প্রস্রাবখানা নির্মাণে ২ লাখ টাকা, সিংগীহাট থেকে ফকিরপাড়া গ্রামের দুটি সড়ক নির্মাণে ৪ লাখ টাকা, স্ট্রিট লাইট মেরামত ও স্থাপনে ৩ লাখ টাকা এবং নালা পরিষ্কারে ৩৫ হাজার ৮৬২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।সরেজমিনে মৈনম হাট ঘুরে দেখা গেছে, আটটি খুঁটির ওপর একটি সেড নির্মাণ এবং দুটি নতুন স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হয়েছে। তবে বরাদ্দ অনুযায়ী দ্বিতীয় সেড নির্মাণসহ অন্যান্য কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি পাওয়া যায়নি। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, হাটে দৃশ্যমান সেড ও স্ট্রিট লাইট স্থাপনে সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা খরচ হতে পারে। তাঁর দাবি, অবশিষ্ট টাকা চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যরা আত্মসাৎ করেছেন। তবে অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো নথিপত্র দেখাতে পারেননি।এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ করেছেন খোদ প্রকল্প সভাপতিরা।মৈনম ইউনিয়নের প্রকল্প সভাপতি ও ইউপি সদস্য সুদেব চন্দ্র বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। শুধু কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে চেয়ারম্যান আমাকে ৩ হাজার টাকা দিয়েছেন।’একই ধরনের অভিযোগ করেন অপর প্রকল্পের সভাপতি ও ইউপি সদস্য আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে প্রকল্পের সভাপতি করা হয়েছিল। এ জন্য চেয়ারম্যান আমাকে ৪ হাজার টাকা দিয়েছেন।
’প্রকল্প সভাপতিদের এমন বক্তব্যে কাজের তদারকি, অর্থ ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।অন্যদিকে কাঁশোপাড়া ইউনিয়নের সিংগীহাটে সরেজমিনে একটি টয়লেট ও প্রস্রাবখানা নির্মাণ, দুটি স্ট্রিট লাইট স্থাপন এবং গ্রামের ভেতরে একটি সড়ক নির্মাণের চিত্র পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি হাটের উন্নয়নের বরাদ্দ দিয়ে গ্রামের ভেতরে সড়ক নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের অনুমোদিত কাজ, বাস্তবায়নের পরিমাণ এবং প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব যাচাই করলেই অনিয়মের বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এ জন্য তাঁরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মৈনম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান ও কাঁশোপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম বলেন, অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকল্পের সব কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।এ বিষয়ে মান্দা উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল কাদের বলেন, ‘হাট দুটির উন্নয়নকাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে। অনিয়মের অভিযোগ সঠিক নয়।’তবে প্রকল্প সভাপতিদের কাজ সম্পর্কে না জানার দাবি এবং সরেজমিনে বরাদ্দ অনুযায়ী সব কাজ দৃশ্যমান না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
