Joy Jugantor | online newspaper

‘বগুড়াকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল’

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১:০১, ২২ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২১:০৪, ২২ অক্টোবর ২০২৬

‘বগুড়াকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল’

বৃহস্পতিবার বগুড়ার হোটেল মম-ইনের অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ প্রতিদিন আয়োজিত ‘উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ার উন্নয়ন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক মতবিনিম

বিগত ২০ বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষ চরম উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বয়স মাত্র সাত মাস। এতদিনের জমে থাকা সমস্যা সমাধান করে উন্নয়ন পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। তবে বগুড়ার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের সুস্পষ্ট ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে’। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি এসব কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বগুড়ার মমইন কনভেনশন সেন্টারে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন আয়োজিত ‘বগুড়ার উন্নয়ন সম্ভাবনা, সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বক্তারা এ সময় উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র ও আড়াই হাজার বছরের সভ্যতার প্রাচীন স্মারক পুণ্ড্রনগরী বগুড়ার দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
এসময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি বলেন, উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা বগুড়াকে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।

বগুড়ার অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বগুড়া কৃষিতে অত্যন্ত উদ্বৃত্ত একটি জেলা। এখান থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার উদ্বৃত্ত খাদ্য জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। অথচ এত বড় সম্ভাবনাময় জেলাকে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে পেছনে ফেলে রাখা হয়েছিল। বর্তমান সরকার বগুড়াকে শিল্প, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নগরায়ণের ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম শীর্ষ ও আধুনিক অঞ্চলে পরিণত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বগুড়ার উন্নয়ন পরিকল্পনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বগুড়ায় শহীদ আরাফাত রহমান কোকো প্যারা স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বগুড়া বহুমাত্রিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়িত হলে পুরো উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীসহ সারা দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় এবং অর্থনীতিতে এক নতুন গতির সঞ্চার হবে।

শহরাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম জানান, নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ইতোমধ্যেই ১ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলার ১৩টি উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন পৌরসভাগুলোর সার্বিক অবকাঠামো ঢেলে সাজাতে আরও ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বগুড়া শহরবাসীকে নাগরিক সুবিধা দিতে বগুড়া ওয়াসা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ডাকবাংলো নির্মাণ ও সংস্কারে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং বিসিক শিল্প পার্কের কাজও খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে।
সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানান, বগুড়ার অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সড়ক সংযোগ উন্নত করতে বিভিন্ন মহাসড়ক চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শহরের তীব্র যানজট নিরসন ও সৌন্দর্যবর্ধন নিশ্চিত করতে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। যমুনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় নদীভাঙন রোধ ও টেকসই পানি সংরক্ষণে ড্যাম্প স্টেশন নির্মাণ এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা শহর থেকে গ্রাম পর্যায়ে সম্প্রসারণের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে জেলার ১৩টি উপজেলায় ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। উচ্চশিক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়কে বহুমাত্রিক উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি ঐতিহাসিক করতোয়া নদীর পাশ দিয়ে চার লেনের একটি আধুনিক সংযোগ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তিনি সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।

জাতীয় উন্নয়ন বরাদ্দের সুষম বণ্টন ও বৈষম্যহীন নীতির কথা উল্লেখ করে মীর শাহে আলম এমপি বলেন, দেশের মানবিক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুরো দেশকে সমান চোখে দেখেন এবং সমতার ভিত্তিতে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চান। এ কথার প্রমাণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, রংপুর সিটি করপোরেশনের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং গোপালগঞ্জ জেলার অবকাঠামোগত উন্নয়নে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে উন্নয়ন কোনো নির্দিষ্ট দলীয় বা ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত যোগ্য প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সমস্ত নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করেও আমাদের মানবিক প্রধানমন্ত্রী জনগণের খুব কাছাকাছি যাচ্ছেন এবং মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর পাশে থেকে বগুড়ার সার্বিক উন্নয়নে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। ইনশাআল্লাহ, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা বগুড়াকে একটি আধুনিক ও উন্নত জেলা হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাব।

মতবিনিময় সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়া দীর্ঘদিন যাবৎ বৈষম্যের শিকার হয়ে পিছিয়ে পড়েছে। এই দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে বগুড়ার কাঙ্ক্ষিত ও প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, ইনশাআল্লাহ বগুড়াকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। বিগত ২০ বছরে বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে যে ধরনের রাজনৈতিক ভণ্ডামি ও প্রতারণা করা হয়েছে, আপনারা সবাই তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে আছেন।

তিনি কঠোর সমালোচনা করে বলেন, বগুড়ার প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে বগুড়ারই কৃতী সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতকে সার্বিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে। ক্রীড়া ক্ষেত্রের অবহেলার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, পূর্বে ক্রীড়া সংগঠক আরাফাত রহমান কোকোর নামে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হলেও বিগত সরকারের চরম অবহেলা ও অযত্নে সেটি বছরের পর বছর অকেজো হয়ে পড়েছিল। বগুড়ার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা রয়েছে উল্লেখ করে আতিকুর রহমান রুমন বলেন, সেই উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রশাসনের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক ও জনপ্রতিনিধি সবাইকে একযোগে মাঠে থেকে কাজ করতে হবে।

দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক লোটন একরামের প্রশাসনিক ও পেশাদারি সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য প্রদান করেন বগুড়া-৬ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুহিত তালুকদার, বিএনপি মিডিয়া সেলের সম্মানিত আহ্বায়ক ডা. মওদুদ ইসলাম আলমগীর পাভেল, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান, বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এমআর ইসলাম স্বাধীন, বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) মহাপরিচালক আব্দুল মজিদ, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কুদরত-ই-জাহান, বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান, জেলা পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ, টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম, বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি রেজাউল হাসান রানু, সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদপ্রমুখ।