একজন অদম্য সংগ্রামী নারী মাকসুদা রহমানের সফলতার গল্প
নারীর জীবনসংগ্রামের গল্পগুলো অনেক সময় নীরবে লেখা হয়। সেই গল্পে থাকে অশ্রু, অভিমান, নিঃসঙ্গতা, সামাজিক চাপ, আপনজনের বিরোধিতা আর প্রতিকূলতার সঙ্গে নিরন্তর লড়াই। কেউ সেই লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে থেমে যান, কেউবা প্রতিটি আঘাতের পর আরও দৃঢ় হয়ে উঠে দাঁড়ান। মাকসুদা রহমান তাঁদেরই একজন—যাঁর জীবনসংগ্রাম শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি একজন নারীর আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও অদম্য সাহসের এক অনন্য উপাখ্যান।বগুড়া শহরের একটি প্রতিষ্ঠিত পরিবারে তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে বেড়ে ওঠেন মাকসুদা রহমান। তাঁর বাবা ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া তাঁর বাবা মুক্তিযোদ্ধার সনদ গ্রহণ করেননি। সন্তানদের তিনি সবসময় নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার শিক্ষা দিতেন। তিন মেয়ের একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হবেন—এমন স্বপ্ন ছিল বাবার। শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যান মাকসুদা।
১৯৯৯ সালে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ২০০৭ সালে পারিবারিক সিদ্ধান্তে তাঁর বিয়ে হয়। বয়সের বড় ব্যবধান এবং নিজের মতের বিরুদ্ধে সেই বিয়ে হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই দাম্পত্য জীবনে শুরু হয় টানাপোড়েন। একদিকে সংসার টিকিয়ে রাখার সামাজিক চাপ, অন্যদিকে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাকসুদার দৃঢ় সিদ্ধান্ত—দুইয়ের মধ্যে শুরু হয় এক কঠিন সংঘাত।তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারিবারিক নানা বাধার কারণে সেই পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে সংসারে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাঁকে ঘরবন্দি করে রাখার ঘটনাও ঘটে। কিন্তু শারীরিকভাবে ঘরের ভেতরে আটকে রাখা গেলেও তাঁর স্বপ্নকে আটকে রাখা যায়নি।
এই কঠিন সময়ে তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে দাঁড়ান মা। নানা, মামা ও এক খালার সহযোগিতাও তাঁকে সাহস জোগায়। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট ছিল বড় বাধা। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য একসময় মায়ের গলার হার বিক্রি করে ভর্তি ফি জোগাড় করা হয়। কখনো গোপনে ক্লাস করে, কখনো নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান।অদম্য সেই চেষ্টার ফলও আসে। ২০১১ সালে আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স এবং ২০১৪ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন তিনি।এরই মধ্যে প্রথম দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। পারিবারিক বিরোধ, মানসিক চাপ এবং শারীরিক নির্যাতনের মতো কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। সেই অন্ধকার সময়ে মায়ের একটি কথা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়—নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, চাকরি খুঁজতে হবে।
হাতে অর্থ ছিল না, তবু হাল ছাড়েননি মাকসুদা। একটি মোবাইল ফোন সংগ্রহ করে শুরু করেন চাকরির সন্ধান। পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খোঁজখবর এবং নিজের যোগ্যতার ওপর বিশ্বাস—সব মিলিয়ে একসময় বিআরডিবির একটি প্রকল্পে নিয়োগের সুযোগ পান। আবেদন করেন, পরীক্ষায় অংশ নেন এবং চাকরিও পেয়ে যান। শুরু হয় তাঁর কর্মজীবনের নতুন অধ্যায়।তবে চাকরি পাওয়ার পরও পারিবারিক দূরত্ব ঘোচেনি। বাবা তখনও তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন না; এমনকি তাঁর সঙ্গে খেতেও চাইতেন না। একজন মেয়ের জন্য বাবার এমন দূরত্ব ছিল গভীর কষ্টের। বহু রাত কান্নায় কেটেছে। কিন্তু কান্না তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি অশ্রুবিন্দু যেন তাঁর ভেতরের শক্তিকে আরও দৃঢ় করেছে।
প্রায় ১১ মাস পর ইউএনডিপির একটি প্রকল্পে চাকরির সুযোগ পান তিনি। আগের চাকরি ছেড়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেন। কর্মদক্ষতা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে থাকেন। সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গিও। প্রায় দুই বছর পর বাবা তাঁর অবস্থান বুঝতে পারেন। দীর্ঘ অভিমানের বরফ গলে যায়। মেয়েকে আবার বুকে টেনে নেন বাবা। স্বাভাবিক হয়ে আসে পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক।জীবনের এই কঠিন অধ্যায়ের মধ্যেই ২০১১ সালে পরিচয় হয় হাদি চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। পরিচয়ের পর তাঁরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তখন মাকসুদা গাজীপুরে চাকরি করছিলেন এবং পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। নিজের ভবিষ্যৎ নিজের হাতে গড়ে নেওয়ার সেই সময়েই তিনি আবারও সংসারের স্বপ্ন দেখেন। ১১ আগস্ট ২০১১ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক মাস পর তিনি জানতে পারেন, স্বামীর আগের একটি বিয়ে ছিল এবং বিষয়টি তাঁর কাছে গোপন করা হয়েছিল।
বিষয়টি জানার পর তাঁর জীবনে আবারও সংকট নেমে আসে। এরই মধ্যে তিনি মা হতে চলেছেন। ভালোবাসা, অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং একটি সংসার টিকিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি সম্পর্কটিকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন।২৬ আগস্ট ২০১২ সালে সাত মাসের গর্ভে জন্ম নেয় তাঁর ছেলে। অপরিণত সেই সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে শুরু হয় কঠিন চিকিৎসাযুদ্ধ। একাধিক চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পর প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় করে মা ও সন্তান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু স্বস্তির সেই সময়ও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সন্তান জন্মের কিছুদিন পরই প্রকল্পের কর্মী ছাঁটাইয়ের তালিকায় পড়ে চাকরি হারান মাকসুদা। একই সময়ে তাঁর স্বামীও বেকার হয়ে পড়েন। গাজীপুরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠলে মায়ের পরামর্শে শিশুসন্তানকে নিয়ে বগুড়ায় ফিরে আসেন তিনি।
এরপর দাম্পত্য জীবনে সংকট আরও গভীর হয়। মাকসুদার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বামীর অবহেলা, আলাদা হয়ে যাওয়া এবং মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মধ্যেও তিনি বারবার সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। কারণ তাঁর কাছে বিষয়টি শুধু একটি সম্পর্কের ছিল না; তিনি চেয়েছিলেন সন্তানের জন্য একটি নিরাপদ পরিবার গড়ে তুলতে।২০১৪ সালে টিএমএসএসের মাইক্রোক্রেডিট বিভাগে চাকরি পান তিনি। পোস্টিং হয় রংপুরে। তখন তাঁর সন্তান মাত্র এক বছরের। বুকের দুধ খাওয়া শিশুকে মায়ের কাছে রেখে তাঁকে আবার কর্মস্থলে ফিরতে হয়। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বুকের কষ্ট চাপা দিয়ে তিনি কর্মজীবন চালিয়ে যান।২০১৫ সালে দাম্পত্য সম্পর্ককে আইনগতভাবে আরেকটি সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। স্বামীও আবার তাঁর কাছে ফিরে আসেন। কিন্তু পুরোনো সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি।২০১৬ সালের একটি রাত তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে আছে। পারিবারিক বিরোধের একপর্যায়ে তিনি গুরুতর আহত হন। আহত অবস্থায় তাঁকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রেখে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। পাশের ফ্ল্যাটের এক বান্ধবীর সহযোগিতায় তিনি উদ্ধার হন। পরদিন সন্তানকে নিয়ে তিনি বগুড়ায় মায়ের কাছে ফিরে আসেন।
এরপরও দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্কটি কখনো বিচ্ছেদ, কখনো ফিরে আসা, আবার কখনো নতুন আশার মধ্য দিয়ে চলেছে। একসময় শাশুড়ির অনুরোধে তিনি সম্পর্কটিকে আরও একটি সুযোগ দেন। কিন্তু পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন হয়নি। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে চূড়ান্তভাবে বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন মাকসুদাএকই বছর বাবাকে হারান তিনি। বাবার মৃত্যু তাঁর জীবনে তৈরি করে গভীর শূন্যতা। যে বাবা একসময় তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন না, সেই বাবার সঙ্গেই শেষ পর্যন্ত অভিমান ভেঙে স্বাভাবিক সম্পর্ক ফিরে এসেছিল। তাই বাবাকে হারানোর বেদনা ছিল আরও গভীর।তবে এত আঘাতও মাকসুদাকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি সংকট তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। সংসার ভেঙেছে, আপনজন হারিয়েছেন, অর্থনৈতিক সংকট পেরিয়েছেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছেন—তবুও কর্মজীবনকে আঁকড়ে ধরে নিজের এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছেন তিনি।আজ মাকসুদা রহমান একজন সফল এনজিওকর্মী। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে অন্যের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছে। তাই সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন।
কুষ্ঠ রোগীদের চিকিৎসাসেবা, পুনর্বাসন, সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন তিনি। সমাজের অনেক মানুষ যাদের থেকে দূরে সরে যায়, তাঁদের কাছেই গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, মানবসেবা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও মহৎ কাজ।বগুড়ার বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রতিবন্ধী সেবা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, প্রতিবন্ধী মানুষ সমাজের বোঝা নয়; তারাও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিশ্বাস থেকেই সংস্থাটির মাধ্যমে নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়তা, হুইলচেয়ার বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।এ ছাড়া অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো, গরিব শিক্ষার্থীদের মেধাবৃত্তি প্রদান, এতিম মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা, সেলাই মেশিন বিতরণ, গাছ ও শীতবস্ত্র বিতরণসহ নানা মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি।
ভবিষ্যতে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন রয়েছে তাঁর। নিজস্ব উদ্যোগে এতিমখানা প্রতিষ্ঠা এবং ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনের মতো বৃহৎ মানবিক কার্যক্রম পরিচালনার ইচ্ছাও রয়েছে।মাকসুদা রহমানের জীবনসংগ্রাম শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও অদম্য সাহসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জীবনের নানা বাঁকে সম্পর্কের টানাপোড়েন, সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট ও আপনজনের অভিমান তাঁকে বারবার থামিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু প্রতিটি প্রতিকূলতার পরই তিনি নতুন করে উঠে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর পথচলা তাই শুধু একজন নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নয়; এটি অদম্য সাহস, আত্মনির্ভরতা ও মানবিকতার এক অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়।
