Joy Jugantor | online newspaper

চুম্বন ও আমার বয়ঃসন্ধিকাল

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৫:৩৪, ২৩ জানুয়ারি ২০২২

চুম্বন ও আমার বয়ঃসন্ধিকাল

ছবি সংগৃহীত

আব্বা হয়ত চাইতেন আমাকে বৈশ্বিক করে তুলতে, কিন্তু রেডিও আর দুদিন পর ঢাকা থেকে আসা ইত্তেফাক ছাড়া তখন তো আর কোনো উপায় নেই জানলা খুলে আকাশ দেখার! বাড়িতে চার ব্যাটারির একটা ওয়ান ব্যান্ড রেডিও ছিল। তা দিয়েই খবর, আধুনিক গানের অনুরোধের আসর, নাটক বা কথিকা শুনতাম, আর ছিলো সিনেমা হল।

সিনেমা হলে শো ছিলো তিনটি। ম্যাটিনি, ইভনিং আর নাইট শো। তবে ‘মর্নিং শো’ নামে ছুটির দিনের সকালে মাঝে মধ্যে বিদেশি ইংরেজি ছবি দেখানো হতো। আব্বা আমাকে মর্নিং শো দেখতে নিয়ে যেতেন। কাহিনী, সংলাপ কিছুই বুঝতাম না। ঘোড়ার দৌড়, গোলাগুলি, খুব জোরে গাড়ির চলা ছাড়া আর যে দৃশ্যের কথা এখনও মনে আছে তা হলো চুম্বন।

প্রায়ই দেখতাম পুরুষ আর নারী মুখে মুখ লাগিয়ে পরস্পরের ঠোঁট চুষছে। ব্যাপারটা বুঝতাম না। আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম ওরা এমন করে কেন? আব্বার জবাব, ‘ওরা চুমু খাচ্ছে’।

পানজর্দা বা ভাতমাছ খাওয়া জ্ঞান নিয়ে চুমু খাওয়ার ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হতো না। আবারও প্রশ্ন করলাম, ‘কেন চুমু খাচ্ছে?’ আব্বার জবাব, ‘ওরা একজন স্বামী আর একজন স্ত্রী, দুজন দুজনকে ভালোবাসে, তাই চুমু খাচ্ছে।’

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা থাকলে চুমু খায়, এ পর্যন্ত বুঝলাম। আর কোনো প্রশ্ন ছাড়া এটাও বুঝলাম, আমার বাবা-মায়ের মধ্যে কোনো ভালোবাসা নেই। কারণ, তারা স্বামী-স্ত্রী হলেও চুমু খায় না।

এ রকম সময়েই একদিন বাড়িতে একটা মলাট দেয়া বই পেলাম ‘স্বামী-স্ত্রীর মিলন রহস্য’। বইয়ের একটা অধ্যায় ছিল ‘বাসর রাত’। সেখানে বাসর রাতে স্বামীর করণীয় হিসেবে নববিবাহিতা স্ত্রীর প্রতি আচরণের স্টেপ বাই স্টেপ বিবরণ দেয়া ছিল। যেমন স্বামী বাসর ঘরে ঢুকবেন, এক গ্লাস দুধ খাবেন, তারপর স্ত্রীর ‘কপোলদেশে চুম্বন’ করবেন।

এ পর্যন্ত পড়ে আমাকে থামতে হয়। কারণ, তখন আমি কপাল চিনি, কপোল চিনি না। বাংলাদেশ চিনি কপোলদেশ চিনি না। চুমু চিনি, চুম্বন চিনি না! ‘স্বামী-স্ত্রীর মিলন রহস্য’ লুকিয়ে পড়ার পর চুম্বন বিষয়ে আগ্রহ বেড়ে গেলো। একদিকে বই পড়া ধারণা আরেক দিকে বাস্তবের সঙ্গে অমিল।

এর মধ্যে হাতে এলো ঝিনুক প্রকাশনীর সুলভ সংস্করণের ‘বাৎস্যায়নের কামসূত্র’। বাড়িতেই ছিল। হয়ত আব্বাই চেয়েছেন আমি পড়ি। তাই বইটি বাইরে ফেলে রেখেছেন যেন আমার চোখে পড়ে। আমি তখন ক্লাস সেভেন বা এইটের ছাত্র। আব্বাকে ভয় নেই, তিনি সারা দিন অফিসে থাকেন। মার চোখ ফাঁকি দেয়া কঠিন নয়। অতএব বইটা পড়ে ফেললাম এবং প্রায় কিছুই বুঝলাম না।

অনেক ধোয়াটে বাংলা শব্দ, যা কোথাও কোনদিন পড়িনি বা শুনিনি। তবে প্রবল এক আকর্ষণ বোধ করলাম বইটার উপর। পড়ার বইয়ের ফাঁকে, লেপের ভাঁজে, বালিশের খোলের ভিতর লুকিয়ে রাখি আর বারবার পড়ি। শব্দগুলো ভেঙে ভেঙে বোঝার চেষ্টা করি। যেমন: ওষ্ঠ মানে যেহেতু ঠোঁট তাহলে উপরোষ্ঠ হলো উপরের ঠোঁট, আর নিম্নোষ্ঠ হলো নিচের। ঠোঁট তাহলে দুটো! একটা না, কী আশ্চর্য! শব্দে শব্দে বিস্ময়!

ততোদিনে আমি জেনে গেছি যাহা চুমু তাহাই চুম্বন। এই বইয়ে পেলাম চুম্বন নামে একটি আলাদা অধ্যায়। যেখানে দেখলাম কেবল ওষ্ঠ নয় বরং আরও অন্তত ১০টি জায়গায় চুম্বন করা যায়, যার কোনোটাই আমি চিনি না। সিনেমায় দেখা কেবল ওই এক রকম নয় বরং আরও অন্তত সাত রকম ভাবে চুম্বন করা যায়। যেমন নায়ক যখন কাজে ব্যস্ত থাকে তখন তাকে বিরক্ত বা বিব্রত করার জন্যে ইয়ার্কি ধরনের চুম্বনকে ‘চলিতক’ বলে।

আবার নায়ক ও নায়িকা একজন আরেক জনকে মনের ভাব জানানোর জন্যে দূর থেকে ইশারায় যে চুমু দেয় তাকে ‘ছায়াচুম্বন’ বলে (এই ছায়াচুম্বনকেই সম্ভবত আজকাল ফ্লাইংকিস বলা হয়)। যাহোক, আগেই বলেছি, পাতায় পাতায় বিস্ময়! এক অধ্যায় ছেড়ে আরেক অধ্যায় বানান করে করে পড়ি আর যেন দুধের সাগর থেকে ক্ষীরের সাগরে হাবুডুবু খাই।

মজার ব্যাপার হলো, আব্বা বলেছিলেন, স্বামী আর স্ত্রী ‘চুমু খায়’, তবে এই বইয়ে লেখা ‘নায়ক আর নায়িকা’। কোথাও স্বামী-স্ত্রীর কথা নেই। তাহলে কি স্বামী-স্ত্রী না হলেও চুমু খাওয়া যায়? তাহলে কি সিনেমার বাইরেও মানুষ নায়ক বা নায়িকা হতে পারে?

ঝিনুকের ওই সংক্ষেপিত সুলভ সংস্করণে সব প্রশ্নের জবাব নেই। আব্বাকে প্রশ্নেরও সুযোগ নেই। মনে প্রবল জানার ইচ্ছা, শরীরে অজানা শিহরণ। আমি তখন ১৪ বছর, আমার তখন বয়ঃসন্ধিকাল।

মহর্ষি বাৎস্যায়নের কামসূত্রের ‘চুম্বন’ অধ্যায় আমার সামনে যেন এক মহা রহস্যের হাতছানি হয়ে দাঁড়ালো। ঠাকুমার ঝুলির দৈত্য বা পাতালপুরির রাজকন্যা আমাকে আর টানে না। দস্যু বনহুরের সবগুলো সিরিজ পড়ি। নূরি আর মনিরা, একজন জংগলে আরেকজন শহরে, বনহুরের দুই স্ত্রী। তাদের সঙ্গে বনহুরের সম্পর্ক ভালোবাসার। অথচ তাদের মধ্যে চুম্বন নেই।

বাৎস্যায়ন লিখেছেন, কেবল নায়কই চুম্বন করবে তা নয়, নায়িকাও চুম্বন করতে পারে। তবে যা পড়ি তাতে কোথাও এসবের উল্লেখ নেই।

এ রকম প্রশ্নময় বয়ঃসন্ধিতে আব্বা কুষ্টিয়ার কুমারখালি বদলি হলেন। আমি যোগেন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ি, পাবলিক লাইব্রেরিটা পাশেই। লাইব্রেরির শিশু সদস্য হলাম। ছোটদের রবীন্দ্রনাথ, ছোটদের শেক্সপিয়ার এ রকম ছোটদের বই অনেক। তবে আমার আগ্রহ বড়দের বইয়ে। লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ি, বই বাড়িতেও আনি।

অনেক উপন্যাসও পড়ছি তখন। প্রেম-ভালোবাসা বিরহের সব কাহিনী। ভালো লাগছে। মনে আছে ‘শাপমোচন’ পড়ে জীবনের বইপড়া কান্নার শুরু। সরলরেখার মতো কাহিনী অথচ প্রচণ্ড ভালো লাগা। এক বিজয়ার দিনে চাকরিপ্রার্থী মহেন্দ্র আসে ধনী মাধুরীদের বাড়িতে। মাধুরী তাকে ভালোবাসতে শুরু করে, কিন্তু সে ভালোবাসায় সাড়া না দিয়ে মহেন্দ্র গ্রামে ফিরে যায়। হারিয়ে যায় মাধুরীর জীবন থেকে। অথচ বিরহী মাধুরী অপেক্ষায় থাকে। প্রত্যেক বিজয়ার দিনে মহেন্দ্রকে চিঠি লেখে, ভাবে একবার যদি এই চিঠি মহেন্দ্রের হাতে পড়ে, যদি আবার মহেন্দ্র ফিরে আসে! সেইসব চিঠির কোনোদিন কোনো উত্তর আসে না।

মহেন্দ্রের এই ভীরুতা ভালো লাগে না আমার। মনে হয়, সে যদি শহরে থেকে যেত, সেও যদি ভালোবাসতো, তাহলে তাদের মধ্যে চুম্বন হতে পারতো। আর একবার চুম্বন হয়ে গেলে এই বিরহ মিলনে রূপ নিতো। কতই না ভালো হতো সেটা।

দেবদাস পড়েও একই রকম মনে হয়েছিল। মনে পড়ে সেই অংশটা। দেবদাস ছিপ ফেলে বসে আছে, পার্বতীও ঠিক সময়ে এসে পড়েছে পুকুর ঘাটে।

“-আমি এসেচি পারু !

পার্ব্বতী কিছুক্ষণ কথা না কহিয়া, শেষে অতি মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করিল,

-কেন?

-তুমি আসতে লিখেছিলে, মনে নেই?

-না।

-সে কি পারু! সে রাত্রের কথা মনে পড়ে না?

-তা পড়ে। কিন্তু সে কথার আর কাজ কী?”

এরপর দেবদাস রেগে গিয়ে ছিপ দিয়ে পার্বতীর মাথায় বাড়ি দেয়। পার্বতীর কপাল কেটে ‘সমস্ত মুখ রক্তে ভাসিয়া গেল। মাটিতে লুটাইয়া পড়িয়া বলিল, দেবদা, করলে কী!’

ঠিক এই সময়ে আমার মনে হয়, ছিপের বাড়ির চেয়ে একটা চুমুর অ্যাকশন বেশি হতে পারতো। দেবদাস সাহস করে পার্বতীকে একটা চুম্বন দিয়ে দিলে সব মান, অভিমান, ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়ে যেত। ফলে দেবদাসকে মরতে হতো না, আবার পার্বতীকেও বুড়ো দোজবরকে বিয়ে করতে হতো না।

যে বই-ই পড়ি সবখানেই ‘হতে হতেও হয় না’। কোথাও চুমুর কোনো বাস্তব বিবরণ নেই। তবে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতাটা পড়ে ধারণাটি একটু স্পষ্ট হয়।

‘চিত চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর’ পড়ে মনে হয় চুম্বনের মধ্যে একটা কম্পনের, একটা আবেশের, একটা মুগ্ধতার ব্যাপার আছে। সুতরাং এটা বেশ স্পেশাল একটা ব্যাপার। এটা যে সত্যি স্পেশাল তা বুঝলাম রবীন্দ্রনাথের ‘চুম্বন’ কবিতাটি পড়ে।

অধরের কানে যেন অধরের ভাষা।

দোঁহার হৃদয় যেন দোঁহে পান করে।

গৃহ ছেড়ে নিরুদ্দেশ দুটি ভালোবাসা

তীর্থযাত্রা করিয়াছে অধর সংগমে।

আর এই কবিতা পড়া মাত্র আমার বোঝার উপর শাকের আঁটি উঠে গেল! কারণ ওষ্ঠ জানি, অধর জানি না। দোঁহা বা দোঁহে কী জানি না। আর সংগম তো জানিই না।

রবীন্দ্রনাথের ‘চুম্বন’ পড়ার পর আমাকে ডিকশনারি কিনতে হলো। মানে আব্বাকে বলে কেনাতে হলো। আর আমি সাগ্রহে অধর, দোঁহা, সংগম ইত্যাদি শব্দের অর্থ খুঁজে নিলাম।

পুরো কবিতাটি আমি বারবার পড়ি আর অজানা শিহরণ, অচেনা অনুভব আর অনাস্বাদিত পুলকে দেহ-মন জেগে ওঠে। একি অকালবোধন নাকি নবজন্ম?

পরে জেনেছি, সেটাই ছিল আমার যৌনজাগরণ (sexual awakening) এবং আমার যৌনদিকস্থিতি (sexual orientation)।

রবীন্দ্রনাথ আমাকে বোঝালেন, চুম্বন কোনো যেনতেন ব্যাপার নয়। কেবল ঠোঁট চোষা নয়। চুম্বন হলো একজনের হৃদয় অন্যজনে পান করা। সাগরের গভীরে ঢেউয়ের উদ্ভব হলে তাকে যেমন এক সময় তীরে এসে আছড়ে পড়তেই হয়; তেমন দুটি মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক প্রেমের নিয়মে যে উচ্ছ্বাস আর অনাবিল কামনা তৈরি হয়; সেটাই অবশেষে চুম্বন হয়ে ‘ভাঙ্গিয়া মিলিয়া যায় দুইটি অধরে’।

দুজনের অবরুদ্ধ ব্যাকুল বাসনা দেহের সীমায় এসে দুজনকে খুঁজে পায়। অতঃপর প্রেমের যে গান তার চূড়ান্ত স্বরলিপি লেখা হয় ঠোঁটে ঠোঁটে-

ব্যাকুল বাসনা দুটি চাহে পরস্পরে

দেহের সীমায় আসি দুজনের দেখা।

প্রেম লিখিতেছে গান কোমল আখরে

অধরেতে থর থরে চুম্বনের লেখা।

লাইব্রেরির বই পড়ি। হলরুমে টিভিতে ইংলিশ সিরিজ দেখি। ‘হাওয়াই ফাইভ ও’ নামে একটা সিরিজ চলতো তখন। কুমারখালি শহরে তখন টিভি দেখা যায় তিন জায়গায়- লাইব্রেরি, কলেজ আর গার্লস স্কুলে।

বই পড়ার পাশাপাশি ফুটবল খেলি তখন নিয়মিত। পুকুরে বা গড়াই নদীতে সাঁতার দিয়ে গোসল করি। গড়াই তখনও প্রাণময়, সেখানে আমি ইলিশ ধরতেও দেখেছি।

শীতে আমাদের স্কুলের মাঠে যাত্রা হতো রুপালি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর উদ্যোগে। বন্ধু উমর সেখানে শিশু চরিত্রে অভিনয় করতো। আব্বা সৌজন্য প্রবেশপত্র পেতেন, আর সেটার ব্যবহার করতাম আমি।

লাকি খান নামে একজন নৃত্যশিল্পী ঢাকা থেকে এসেছিলেন একবার। তার নাচ দেখলাম কাছ থেকে। ছোট কাপড়ে সেই প্রথম নারী দেহের চড়াই উৎরাই দেখা। একদিকে চুম্বনের প্রতি আগ্রহ, অন্যদিকে নারীদেহের পৃথক বৈশিষ্ট্য আমাকে বড়ো করে তুলছিলো। আমার কথা বলা কমলো, কল্পনা করা বাড়লো।

কৌতুহলের মাত্রা যাই হোক, সত্যি বলছি, নিজে চুম্বন করবো বা আমাকে কেউ চুম্বন করবে এমন কোনো ভাবনা তখনও মনে আসেনি। তবে প্রশ্ন এসেছে। বাৎস্যায়ন, নজরুল বা রবীন্দ্রনাথের বর্ণিত চুম্বনের সঙ্গে মর্নিং শোর সিনেমায় দেখা সাদা মেম-সাহেবদের চুম্বনে মিল নেই কেন? এদের চুম্বনে ওই কম্পন, আবেশ বা হৃদয় পান করার মেজাজটা নেই কেন?

ফলে নিজেদের দেশের দুটি মানুষ চুম্বন করছেন এটা দেখার, দেখে ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট করে বোঝার ইচ্ছাটা যেন আরও জোরালো হলো।

এই সময়ে আশার আলো নিয়ে এলো ‘অনন্ত প্রেম’। চিত্রালীতে পড়লাম ‘অনন্ত প্রেম’ নামে একটা সিনেমা আসছে যেখানে রাজ্জাক-ববিতা চুম্বন করবে। কুমারখালির ‘জলি’ সিনেমা হলে আসার আগেই নতুন সিনেমাগুলো প্রথমে আসতো কুষ্টিয়ার বনানী, রক্সি বা কেয়া হলে। আমি অপেক্ষায়। এই সিনেমা আমাকে দেখতেই হবে।

সিনেমা এলো রক্সি হলে। স্কুল ফাঁকি দিয়ে দেখলাম। কিন্তু চুমু তো নেই! তাহলে?

‘অনন্ত প্রেম’-এ চুম্বন না দেখতে পেয়ে ভাঙা মনের রথে চেপে রক্সি হল থেকে বেরিয়ে বড় বাজার রেলগেট পার হয়ে রবীন্দ্রনাথের টেগর লজ ডানে রেখে কুষ্টিয়া স্টেশনে এসে ট্রেনে চেপে কুমারখালি ফিরলাম।

ছবিটা সুন্দর, ভীষণ রোমান্টিক। কিন্তু রাজ্জাক আর ববিতার চুম্বন দৃশ্য দেখা হলো না বলে আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো টাকাই নষ্ট। এতগুলো টাকা জোগাড় করতে হলে আমাকে এরপর বহুবার বাসার বাজার করতে যেতে হবে।

পরে চিত্রালীতেই পড়েছিলাম, এই ছবিতে অভিনয়ের জন্যে ববিতার পারিশ্রমিক ছিলো ৫০ হাজার টাকা। পরিচালক রাজ্জাক ছবির শেষ দৃশ্যে চুম্বন যুক্ত করায় ববিতা আরও ২০ হাজার টাকা বেশি নিয়েছিলেন। দৃশ্যটি সেন্সরে ছাড়ও পেয়েছিল, কিন্তু রাজ্জাক ছবিটি বাজারজাত করার আগে চুম্বনটি বাদ দেন।

ববিতা তখন ১৭ বছরের অবিবাহিতা। তিনি তার বিয়ের ব্যাপারে উৎকণ্ঠিত ছিলেন। হয়ত সে কারণেই রাজ্জাক দৃশ্যটি আর রাখেননি।

কবিতার কোনো চল ছিলো না বাড়িতে। আব্বা মাঝে মাঝে স্মৃতি থেকে রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের কবিতা আওড়াতেন। ক্লাসের বইয়ে গদ্যের সঙ্গে পদ্যও থাকতো। তবে কেবল কবিতা নিয়েই আলাদা বই হতে পারে এমন ধারণা ছিলো না। এমন সময়ে পাবলিক লাইব্রেরিতে একদিন বুদ্ধদেব বসুর একটা কবিতার বই পেলাম। নাম মনে নেই, কিন্তু মনে আছে একটা কবিতা ছিল এমন-

রুপোলি জল শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখছে সমস্ত আকাশ

নীলের স্রোতে ঝরে পড়ছে তার বুকের উপর সূর্যের চুম্বনে।

কিংবা-

শুধু নয় সুন্দর অপ্সর-যৌবন

কম্পিত অধরের চম্পক-চুম্বন।

তাহলে মানব-মানবী নয় কেবল, সূর্যও চুমু খায় রুপোলি জলকে? আমার আরেক সর্বনাশ ঘটলো এই কবিতার বইটি পড়ে। কত কত সুন্দরের বিবরণ! অধরা, অদেখা সব শব্দের খেলা। কিছু বুঝি, বেশিরভাগই বুঝি না।

জীবনে কবিতা এলো। রোদ, আলো, সমুদ্রের উপমা এলো। এখন বুঝি, সেই সময়ে, আজকের যে আমি, তার নির্মাণ ঘটছিলো। প্রতিদিন নতুন কিছু যুক্ত হচ্ছিলো অনুভবে, কল্পনায়। আমি বড় হয়ে উঠছিলাম সেই চৌদ্দ বছর বয়সে।

লেখক: জাতিসঙ্ঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর দপ্তরের হিউম্যান রাইটস অফিসার

Add