Joy Jugantor | online newspaper

বন্ধু প্রতিম দেশের টিকা প্রীতি

 মোঃ ফরিদুর রহমান  

প্রকাশিত: ২২:১৬, ২৫ এপ্রিল ২০২১

আপডেট: ২২:২৩, ২৫ এপ্রিল ২০২১

বন্ধু প্রতিম দেশের টিকা প্রীতি

প্রতীকী ছবি।

টিকা তৈরি হওয়ার আগে বিশ্ব ছিল অনেক বেশি বিপদজনক। এখন সহজেই আরোগ্য করা যায় এমন সব রোগে আগে লক্ষ লক্ষ মানুষ বিনা চিৎিসায় মারা যেত। টিকার প্রথম ধারণা তৈরি হয় চীনে। ১০ম শতাব্দীতে 'ভ্যারিওলেশন' নাম এক চীনা চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত ছিল যেখানে অসুস্থ রোগীর দেহ থেকে টিস্যু নিয়ে সেটা সুস্থ মানুষের দেহে স্থাপন করা হতো। অতিমারী করোনায় লণ্ডভণ্ড বিশ্বে টিকার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। 

বর্তমানে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত সংক্রমণ ও  মৃত্যুতে বেশ এগিয়ে। বলা হচ্ছে নতুন ভ্যারিয়েন্ট তিন বার মিউটেশন করে এবং সংক্রমণ হার তিন শতভাগ। বিনা চিকিৎসা ও অক্সিজেন সঙ্কটে প্রতিদিন ভারতে মারা যাচ্ছে ২ থেকে ২.৫ হাজার মানুষ। বাংলাদেশে সীমান্তবর্তী এমন অনেক পরিবার আছে যাদের রান্নাঘর ভারতে, শোবার ঘর বাংলাদেশে, আমদানী-রপ্তানী, চিকিৎসা ও ভ্রমনে যাতায়াত তো আছেই। তাই বোধ করি ভারতের করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে আসে নাই বা আসবে না বলা সমীচিন হবে না। 

একটি চুক্তির আওতায় ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে তৈরি করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন  ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদন করছে এবং ভারতীয় এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই বেক্সিমকো একটি চুক্তি করেছে। আর বেক্সিমকোর কাছ থেকে ওই টিকা নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। তবে বাংলাদেশের ওই টিকার সংরক্ষণ ও সরবরাহসহ আনুষঙ্গিক দায়িত্ব বেক্সিমকো পালন করছে। তবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে ভারত থেকে চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো করোনার টিকা পাচ্ছে না বাংলাদেশ। ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত ‘কূটনৈতিক বার্তা’ পাঠানো হয়েছে। এতে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কূটনৈতিক তৎপরতার পরও অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ‘কোভিশিল্ড’ পাওয়ার বিষয়টি শিগগিরই সুরাহা হচ্ছে না। এই অবস্থায় বিকল্প উৎসের প্রতি জোর দিচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে করোনা টিকা পেতে ভারতবিহীন নতুন জোটে শরিক হয়েছে বাংলাদেশ। করোনা টিকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে বাংলাদেশ, চীন, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মঙ্গলবার (২৭ এপ্রিল) ভার্চুয়াল বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন।

জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে শনিবার পর্যন্ত টিকা মজুত ছিল ২৭ লাখ ১৭ হাজারের কিছু বেশি। এখন প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ টিকা দেওয়া হচ্ছে। এ হারে টিকা দেওয়া চলতে থাকলে খুব অল্প সময়ে টিকা ফুরিয়ে যাবে। শিগগির টিকার নতুন চালান না এলে প্রথম ডোজ পাওয়া অনেকেই দ্বিতীয় ডোজ টিকা পাবেন না। এছাড়া ইতিমধ্যে নিবন্ধন করেছেন, এমন অনেক মানুষকে টিকার অপেক্ষায় থাকতে হবে। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার ব্যাপারে বিকল্প উৎসকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি বাংলাদেশ সরকার। বিকল্প হিসেবে চীন ও রাশিয়ার উদ্ভাবিত টিকার কথা ভাবার সুযোগ ছিল। বাংলাদেশ এ দুটি বিকল্পের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। ভারতের ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণে এ অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। টিকার বিষয়টি এমন যে প্রথম ডোজ অ্যাস্ট্রোজেনেকা দ্বিতীয় ডোজ অন্য কোম্পানির দেওয়া যাবে এরকম কোন তথ্য নেই। সে মোতাবেক আমাদের যারা প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন তাদের জন্য হলেও অবশিষ্ট ডোজ টিকা ভারতকে দিতেই হবে। টিকা প্রদানে গড়িমশির কারণে সেরামের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তি বাতিল হয়েছে। 

৭১ এ ভারত আমাদের সহযোগীতা করেছে ঠিক তাই বলে আর কত?   বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিকেলসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মি. হাসান সাংবাদিকদের বলেছেন “সরকার ১.৫ কোটি ডোজের অগ্রিম টাকা দিয়েছে, এসেছে ৭০ লাখ অবশিষ্ট ৮০ লাখ ভারতকে দিতে হবে। টাকা নিয়ে টিকা দেবে না এটা গ্রহণযোগ্য না।” 

শুধুমাত্র সেরামের উপর নির্ভর করা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করাতে যেটা হয়েছে ওদের টিকা এখন আমরা না পেলে অন্য টিকা পেতে অনেক সময় লেগে যাবে৷ কারণ, এখন তো টিকার অনেক ডিমান্ড৷ সবাই কিনতে চাচ্ছে৷ কিন্তু আগে যারা বুকিং দিয়েছে, তারা আগে পাবে৷ একাধিক বিকল্প না হোক অন্তত আরো একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা উচিত ছিল৷ সেরামের টিকা ফার্মেসিতে ২৫০ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে অথচ আমরা পাচ্ছি না। সকলেরই মনে থাকবার কথা গত বছর পেঁয়াজের ক্রাইসিসের সময় আমাদের এলসি করা পেঁয়াজ বিনা নোটিসে ভারত রপ্তানি বন্ধ করেছিল। শুকনো মৌসুমে পানির হাহাকার অথচ বর্ষাকালে পদ্মা, তিস্তার পানিতে আমাদের হাবুডুবু খেতে হয় এ কথা অনেকেই ভুলে থাকেন। 
আশা করা যাচ্ছে জুলাই-আগস্টে WHO ৭/৮ টি টিকার অনুমোদন দিবে। এদিকে জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সেরামের টিকা নিচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে তাদের উৎপাদিত টিকা বিক্রির জায়গা থাকবে না। তখন আমাদের নেয়ার বিষয়টি ভাবতে হবে। গবেষকরা বলছেন টিকা নেয়ার পর কেউ করোনায় আক্রান্ত হলেও তার শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য সমস্যা জটিল হয় না, তাই টিকার চাহিদা এখন বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ছয় ধরনের টিকা উৎপাদন করত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবহেলা, অদূরদর্শিতা, অনিয়ম ও অদক্ষতার কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানে টিকা উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। টিকা উৎপাদনে সক্ষম হয়ে ওঠার এখনই বাস্তবসম্মত ও জরুরী।

লেখক: ফরিদুর রহমান,
 উপ সহকারী কৃষি অফিসার
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বগুড়া