শিশুদের অনলাইন তদারকিতে অভিভাবকদের আইনি বাধ্যবাধকতায় আনলো ইউএই
সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর হয়েছে নতুন চাইল্ড ডিজিটাল সেফটি (সিডিএস) আইন। এই আইনের ফলে এখন থেকে শিশুদের ডিজিটাল কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা শুধু অভিভাবকত্বের অংশ নয়, বরং একটি আইনগত দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হবে। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) গলফ নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।প্রতিবেদনে বলা হয়ছে, নতুন আইনটি ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্ট, অতিরিক্ত ডিজিটাল আসক্তি এবং শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইন ডিজিটাল নিরাপত্তাকে পরামর্শের স্তর থেকে সরিয়ে এনে সরাসরি আইনি কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছে, যেখানে অভিভাবক, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সেবা প্রদানকারীদের স্পষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।সিডিএস আইন শুধু ইউএইভিত্তিক কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য নয়। বিদেশে অবস্থান করলেও যেসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমিং সার্ভিস, অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ইউএইর শিশুদের লক্ষ্য করে সেবা দেয়, তাদেরও এই আইন মানতে হবে। এছাড়া আইন বাস্তবায়নে বয়স যাচাই ব্যবস্থা, কনটেন্ট ফিল্টারিং, প্যারেন্টাল কন্ট্রোল এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপনের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
আইনটি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে অভিভাবকদের ভূমিকায়। এখন থেকে যেকোনো অভিভাবক বা তত্ত্বাবধায়ককে শিশুদের অনলাইন কার্যক্রম সক্রিয়ভাবে নজরদারিতে রাখতে হবে। বিএসএ ল’র টিএমটি অ্যাসোসিয়েট মারিনা এল হাচেম বলেন, ‘আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অভিভাবকদের শিশুদের ডিজিটাল কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে হবে, প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার করতে হবে এবং বয়স অনুপযুক্ত অ্যাকাউন্ট তৈরি বা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যাবে না।’তিনি আরও বলেন, ‘শিশুদের গোপনীয়তা, মর্যাদা ও মানসিক সুস্থতা ক্ষুণ্ন হয়- এমন কোনো অনলাইন কার্যক্রম থেকেও অভিভাবকদের বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিকর বা পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোও বাধ্যতামূলক। এই আইন অভিভাবকত্বকে একটি আইনি দায়িত্ব হিসেবে পুনর্নির্ধারণ করেছে।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নতুন আইনে শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের লিখিত ও যাচাইযোগ্য সম্মতি ছাড়া কোনো তথ্য সংগ্রহ বা ব্যবহার করা যাবে না।আইনে বলা হয়েছে, প্ল্যাটফর্মগুলোকে সহজে সম্মতি প্রত্যাহারের সুযোগ দিতে হবে এবং শিশুদের তথ্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বা লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সীদের অনলাইন বাণিজ্যিক গেম, জুয়া ও বাজির মতো প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে এ ধরনের সাইটে প্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।ইউএই সাইবারসিকিউরিটি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ৮ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের ৭২ শতাংশ প্রতিদিন স্মার্টফোন ব্যবহার করে। তবে মাত্র ৪৩ শতাংশ অভিভাবক নিয়মিতভাবে তাদের সন্তানের অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত অনলাইন হুমকির বড় অংশই প্রযুক্তিগত দুর্বলতার চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের ওপর নির্ভর করে।
প্রুফপয়েন্টের মধ্যপ্রাচ্য ও তুরস্ক অঞ্চলের প্রধান কেনান আবু লতাইফ বলেন, ‘সাইবার অপরাধীরা মানুষের আচরণকে কাজে লাগায়। শিশুদের ক্ষেত্রে পরিচিতি, পুনরাবৃত্তি ও দৈনন্দিন অনলাইন অভ্যাস ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।’ তার মতে, শিশুরা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করে- যেমন নাম, ছবি, ভয়েস নোট, স্কুলের তথ্য, অবস্থান এমনকি একাধিক প্ল্যাটফর্মে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহারের মাধ্যমেও।
২০২৬ সালকে ‘ইয়ার অব দ্য ফ্যামিলি’ ঘোষণা করেছে ইউএই। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিডিএস আইন শুধু নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং পরিবার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে। তাদের মতে, সচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং পারিবারিক পর্যায়ে দায়িত্বশীল তদারকিই শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
