দীর্ঘ ২৫ বছর পর শুরুর পথে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়
দীর্ঘ ২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চালুর পথে বগুড়ার বহুল প্রত্যাশিত বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এটি আর শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে থাকছে না। নতুন খসড়া আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখা হয়েছে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের।গত ১৮ জুন ২০২৬ মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিজ্ঞান প্রযুক্তি না করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। এ সংক্রান্ত আইনের খসড়া প্রণয়নের জন্য শিক্ষামন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য জানিয়েছে।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক নিয়োগ ও শিক্ষা কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। খসড়া আইনে পূর্বের বিশেষায়িত কাঠামো পরিবর্তন করে প্রস্তাব করা হয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার।
নতুন আইনের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি জীববিজ্ঞান, প্রকৌশল, কারিগরি শিক্ষা, কলা, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন, আইন, কৃষি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে। আধুনিক যুগের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতেই ‘বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে।বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয় ২০০১ সালে শেষদিকে ১৫ জুলাই ‘বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০১’ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।বগুড়া-০৭ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য ও চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মোঃ হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু সহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন,সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রস্তাবিত জায়গা ছিল 'জামালপুর' সেটা বর্তমানে বগুড়া-০৭ আসনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা কারণে পরবর্তী দুই যুগের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এগোয়নি।২০০১ সালে "বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়" বগুড়ার জামালপুর এলাকায় প্রতিষ্ঠার জন্য গেজেট প্রকাশ হলেও ২০০৬ সালে বিএনপির সরকার পরবর্তী প্রায় ২ বছর জরুরি অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা ছিল।২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ ১৭ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক বা এ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে প্রকল্পটি কার্যত স্থবির অবস্থায় ছিল দীর্ঘদিন।বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের বিষয়েও বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। ক্ষমতার দাপটে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বগুড়া–৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রাগেবুল আহসান রিপু'র হস্তক্ষেপে বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বগুড়া-০৭ আসন থেকে সদর উপজেলার শেখেরকোলা ইউনিয়নের নুরুইল গ্রামের পূর্ব পাশে, মাটিডালী-পীরগাছা সড়কের সংলগ্ন নুরুইলের বিলে প্রায় ৬০ একর খাস জমিতে ক্যাম্পাস স্থাপনের প্রাথমিক আলোচনা হয়।
তবে পরে সেই প্রস্তাব আর এগোয়নি এবং স্থানটি চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০১-এর ধারা ৩(১) অনুযায়ী বগুড়া জেলার জামালপুর এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের বিধান রয়েছে। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মাহদী হাসান ৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে শাজাহানপুর উপজেলার জামালপুর মৌজা ভূমি অধিগ্রহণের জন্য বগুড়ার জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন।এদিকে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার নাম আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে নির্ধারিত ওই স্থানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মিত হতে পারে শেষ পর্যন্ত।দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের পথে অগ্রগতি হওয়ায় স্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, দ্রুত প্রশাসনিক নিয়োগ সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হবে।বর্তমানে দেশে ৫৮টি অনুমোদিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১১৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ১০৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব আইন অনুযায়ী পরিচালিত হলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০’-এর আওতায়। ২০২৪ সালের শেষের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। এরপর ২০২৫ সালের ৩ জুন প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. কুদরত–ই–জাহান।বিশ্ববিদ্যালয়টির সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে কুদরত-ই-জাহান জানালেন, বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেই প্রাথমিকভাবে দুটি বিভাগ চালু করা হয়েছে। চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পেলে ২০২৬-২৭ সেশনে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হতে পারে।‘বিজ্ঞান প্রযুক্তি থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে আইনটি এখনো হাতে পাইনি; হাতে পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে।
