অনাহারী মানুষের মুখে প্রতিদিন দুপুরে বিনামূল্যে খাবার তুলে দিচ্ছে মুনলাইট
বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা। প্রতিদিন দুপুর হলেই এখানে জড়ো হন এতিম, প্রতিবন্ধী, ছিন্নমূল, রিকশা শ্রমিক ও অসহায় পথচারীরা। তাদের অপেক্ষা একবেলা গরম খাবারের জন্য। প্রায় পাঁচ বছর ধরে এসব মানুষের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে মানবিক সংস্থা মুনলাইট ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি।২০২১ সালের ১৬ জুন করোনা মহামারির সময়ে কর্মহীন, অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের পাশে দাঁড়াতে এই কার্যক্রম শুরু করে মুনলাইট। তৎকালীন বগুড়া জেলা প্রশাসক কার্যক্রমটির উদ্বোধন করেন। পরবর্তীতে মানুষের প্রয়োজন ও চাহিদার কথা বিবেচনা করে কার্যক্রমটি অব্যাহত রাখা হয়।
সংস্থাটির নিজস্ব বাগানে উৎপাদিত বিষমুক্ত সবজিসহ খাবারের তালিকায় থাকে বড় মাছ, ছোট মাছ, ডিম, মুরগির মাংস, গরুর মাংস, শুটকি মাছ ও ডাল। পুষ্টির বিষয়টি বিবেচনা করেই এসব খাবারের আয়োজন করা হয়।সাতমাথায় নিয়মিত খাবার নিতে আসা রিকশা শ্রমিক ওয়াহাব বলেন, প্রতিদিন দুপুরে খাবারের জন্য আগে ৯০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতো। এখন মুনলাইটের খাবার খেয়ে মাসে প্রায় তিন হাজার টাকা সাশ্রয় হয়। এই টাকা পরিবারের প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করি। এখানকার খাবার খুবই ভালো ও পুষ্টিকর।ঠনঠনিয়া এলাকার বাসিন্দা জাহানারা (৬০) বলেন, সারাদিন ভিক্ষা করে যা পাই তা দিয়ে কোনোমতে চলে। আগে দুপুরে অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হতো।
এখন দুপুর হলেই সাতমাথায় এসে খাবার পাই। ভাতের সঙ্গে মাছ, মাংস, ডিম ও সবজি দেওয়া হয়। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যারা এই কাজ করছেন তারা ভালো থাকুন।সাতমাথায় এ খাবার বিতরণ সম্পর্কে মুনলাইটের নির্বাহী কমিটির সদস্য মনজুরুল হক টুটু বলেন, করোনাকালে অনেক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন। ছিন্নমূল মানুষ বিভিন্ন জায়গায় খাবারের জন্য ঘুরেও সহায়তা পেতেন না। তাদের কথা বিবেচনা করেই এই কার্যক্রম শুরু করা হয়। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের বিভিন্ন দানশীল মানুষের সহযোগিতায় এটি পরিচালিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মুনলাইটের প্রতিটি কার্যক্রম জনকল্যাণমূলক।
খাবার বিতরণের পাশাপাশি এতিম শিশু প্রতিপালন, প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।বগুড়া শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, মুনলাইটের খাবার বিতরণ কার্যক্রম অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দুপুর হলেই অনেক মানুষ এখানে এসে খাবারের জন্য অপেক্ষা করেন। পুষ্টির বিষয়টি বিবেচনা করে মাছ, মাংস, ডিম, সবজি ও ডালসহ খাবার দেওয়া হয়।বগুড়া পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক আবু হাসনাত শহীদ বলেন, আমি একাধিকবার সাতমাথায় এসে নিজ হাতে খাবার বিতরণ করেছি। মানুষের কথা শুনে বুঝেছি, অনেক অসহায় মানুষ নিয়মিত পেট ভরে খাবার পান না। মুনলাইটের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।বিনামূল্যে খাবার বিতরণের পাশাপাশি মুনলাইটের উদ্যোগে এসব অসহায় মানুষের জন্য আয়োজন করা হয় নানা মানবিক কর্মসূচি।
প্রতিবছর ফল উৎসবে তাদের আম, কাঁঠাল, লিচু, লটকনসহ মৌসুমি ফল খাওয়ানো হয়। দুই ঈদে দেওয়া হয় পোলাও ও গরুর মাংসের ভুনা। কোরবানির ঈদে গরু কোরবানি করে মাংস বিতরণ করা হয়। রমজানে মাসব্যাপী ইফতার আয়োজন, গ্রীষ্মে ঠান্ডা শরবত এবং শীতে কম্বল, হুডি, সোয়েটার, স্যান্ডেল ও মোজা বিতরণ করা হয়।এছাড়াও গাবতলী উপজেলার কলাকোপা সুবাদ বাজারে পরিচালিত হচ্ছে মুনলাইট অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়। এখানে শতাধিক প্রতিবন্ধী শিশুকে উপযোগী শিক্ষা, চিকিৎসা, থেরাপি, পোশাক, খাবার ও যাতায়াত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও সেখানে মুনলাইট উইকেয়ারট্রাস্ট হেলথ কমপ্লেক্সের মাধ্যমে প্রতি শুক্রবার বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ প্রদান করা হয়। এ পর্যন্ত হাজারো মানুষ এই স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছেন এবং শতাধিক মানুষের চোখের ছানি অপারেশন করা হয়েছে।
প্রবীণ ভাতা, শিক্ষাবৃত্তি, প্রতিবন্ধীদের সহায়তা, নারীদের কর্মসংস্থান, সুদমুক্ত ঋণ, ছাগল পালন, সেলাই মেশিন প্রদান, রিকশা বিতরণসহ নানা কর্মসূচিও পরিচালনা করছে সংগঠনটি।বগুড়া শহরের নাটাইপাড়ায় পরিচালিত মুনলাইট চিলড্রেনস হোমে এতিম ও অসহায় শিশুরা বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছে। বর্তমানে এসব শিশুর অনেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। আধুনিক শিক্ষা, পুষ্টিকর খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠছে তারা।সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সমাজসেবা ও প্রতিবন্ধিতা উত্তরণে ২০২২ সালে সারাদেশের সেরা সংগঠনের পুরস্কারপ্রাপ্ত মুনলাইট ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির এসব উদ্যোগে উপকৃত হচ্ছেন হাজারো অসহায় মানুষ। মুনলাইটের এই মানবিক উদ্যোগে উপকৃত মানুষের প্রত্যাশা—ক্ষুধার্ত ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এই কার্যক্রম যেন অব্যাহত থাকে।
