আকবরিয়া ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক অনন্য প্রতিষ্ঠান
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়া—হাজার বছরের ইতিহাস, প্রত্নঐতিহ্য, লোককাহিনি ও সমৃদ্ধ খাদ্যসংস্কৃতির এক অনন্য জনপদ। প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী মহাস্থানগড় যেমন এ জনপদের গৌরবের প্রতীক, তেমনি প্রায় ১২০ বছর ধরে আস্থা, আতিথেয়তা ও সেবার এক অনন্য নাম আকবরিয়া। আকবরিয়ার যাত্রা শুরু ১৯০৫ সালে। মরহুম মোহাম্মদ খোশজাহান আলী বগুড়া শহরে ‘মোহাম্মদ আলী রেস্টুরেন্ট’ নামে একটি ছোট্ট খাবারের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। সততা, গুণগত মান এবং আন্তরিক সেবার কারণে অল্প সময়েই এটি মানুষের আস্থা অর্জন করে।
পরবর্তীতে তাঁর পুত্র মরহুম আলহাজ্ব আকবর আলী ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল’। সেই ছোট্ট রেস্টুরেন্ট সময়ের পরিক্রমায় উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ ও সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।আকবরিয়া লিমিটেডের চেয়ারম্যান হাসান আলী আলালের পরিকল্পনায় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শাখার অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় স্থান পেয়েছে প্রাচীন পুণ্ড্রনগর মহাস্থানগড়, বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর, শীলাদেবীর ঘাট, বৈরাগীর ভিটা, মহাস্থান জাদুঘরসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের শিল্পসম্মত প্রতিরূপ, আলোকচিত্র ও তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনা। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত অতিথিরা সুস্বাদু খাবারের পাশাপাশি বগুড়ার ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি ও প্রত্নঐতিহ্য সম্পর্কেও জানতে পারছেন।
পর্যটন ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় ইতিহাস, প্রত্নসম্পদ ও সংস্কৃতিকে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এভাবে উপস্থাপনের উদ্যোগ বাংলাদেশে খুবই বিরল। এই উদ্যোগ দর্শনার্থীদেরও সমানভাবে মুগ্ধ করছে। ঢাকা থেকে আসা ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান বলেন, আকবরিয়ার খাবার খুবই সুস্বাদু। এখানে বগুড়ার ইতিহাস এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে খাবারের পাশাপাশি অনেক নতুন তথ্যও জানতে পেরেছি। খুলনা থেকে আগত এক পর্যটক জানান, বাংলাদেশে অনেক বড় বড় রেস্টুরেন্ট দেখেছি, কিন্তু ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে এভাবে ধারণ করে সাজানো প্রতিষ্ঠান খুব কমই আছে। এটি সত্যিই একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
দীর্ঘ পথচলায় আকবরিয়া শুধু সুস্বাদু খাবারের জন্যই নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত। প্রতিদিন অসহায় মানুষের মাঝে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ, রমজানে ইফতার কর্মসূচি, শীতবস্ত্র বিতরণ, দুর্যোগকালে খাদ্য সহায়তাসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে আকবরিয়া লিমিটেডের অধীনে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি, কনফেকশনারি, দুগ্ধজাত পণ্য, ঘি, ফাস্টফুড এবং বিভিন্ন এফএমসিজি পণ্য উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
আকবরিয়া লিমিটেডের চেয়ারম্যান হাসান আলী আলাল বলেন, মহাস্থানগড় বাংলাদেশের গৌরব, আর পুণ্ড্রবর্ধন আমাদের সভ্যতার শিকড়। এই ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, নতুন প্রজন্মের সামনে জীবন্তভাবে তুলে ধরতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই আকবরিয়ার বিভিন্ন শাখার নকশা ও পরিবেশে বগুড়ার ইতিহাস ও লোকজ সংস্কৃতিকে স্থান দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন। তারা যখন মহাস্থানগড়, বেহুলা-লখিন্দর, শীলাদেবীর ঘাট কিংবা বৈরাগীর ভিটার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন, তখন আমাদের এই উদ্যোগ সার্থক বলে মনে হয়। সময়ের পরিক্রমায় স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে লালন করে মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে আকবরিয়া।
