Joy Jugantor | online newspaper

ওভারপাসের দেয়ালে বগুড়ার ইতিহাস-ঐতিহ্যের চিত্রকর্ম পরিদর্শনে- এমপি বাদশা

নিজস্ব  প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২০:৩০, ৬ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ২০:৩১, ৬ নভেম্বর ২০২৬

ওভারপাসের দেয়ালে বগুড়ার ইতিহাস-ঐতিহ্যের চিত্রকর্ম পরিদর্শনে- এমপি বাদশা

ওভারপাসের দেয়ালে বগুড়ার ইতিহাস-ঐতিহ্যের চিত্রকর্ম, পরিদর্শনে এমপি

একসময় দেয়ালজুড়ে ছিল পোস্টার, ব্যানার, বিজ্ঞাপন আর অননুমোদিত দেয়ালিকার দখল। সেই বিবর্ণ কংক্রিটের দেয়ালেই এখন রঙের তুলিতে জীবন্ত হয়ে উঠছে বগুড়ার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি। মহাস্থানগড়, বেহুলার বাসরঘর, বৈরাগীর ভিটা, জিয়ত কুণ্ডু থেকে শুরু করে বগুড়ার বিখ্যাত দই, আলু ও ঐতিহ্যবাহী লাল মরিচ—সবই স্থান পাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ম্যুরালে। কংক্রিটের দেয়াল যেন পরিণত হচ্ছে উন্মুক্ত শিল্পগ্যালারিতে।আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে বগুড়া মহানগরীর বারোপুর ওভারপাসের দেয়ালে চলমান এই ব্যতিক্রমী চিত্রকর্ম পরিদর্শন করেন বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা।পরিদর্শনকালে তিনি চিত্রকর্মে বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থানীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি জেলার জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত বগুড়ার দই, বিশেষ করে নবাবী দইয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী পণ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার পরামর্শ দেন।রেজাউল করিম বাদশা বলেন, বগুড়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই এ উদ্যোগের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

চিত্রকর্মের মাধ্যমে ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা অত্যন্ত শিক্ষণীয় একটি বিষয়। এটি নিঃসন্দেহে সবার কাছে ভালো লাগবে এবং নতুন প্রজন্ম নিজেদের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে।বগুড়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চারলেন জাতীয় মহাসড়কের বগুড়া মহানগর অংশে একটি রেল ওভারপাস ও দুটি ওভারপাস রয়েছে। এর মধ্যে বারোপুর ওভারপাসের উত্তর-পূর্ব দিকের দেয়ালে অ্যাক্রেলিক রঙে আঁকা হচ্ছে একের পর এক দৃষ্টিনন্দন চিত্রকর্ম। এসব চিত্রকর্মে তুলে ধরা হচ্ছে বগুড়ার গৌরবময় অতীত, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোককথা, কৃষি ও খাদ্যসংস্কৃতি।চিত্রকর্মগুলোতে স্থান পেয়েছে প্রাচীন পুণ্ড্রনগর ও মহাস্থানগড়, বেহুলার বাসরঘর, বৈরাগীর ভিটা, জিয়ত কুণ্ডু, বগুড়ার দই, আলু, লাল মরিচ, লাঙল দিয়ে হালচাষসহ এ অঞ্চলের ইতিহাস ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার নানা অনুষঙ্গ। প্রতিটি ছবিতে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে এই জনপদের স্বতন্ত্র পরিচয়।এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল ও কলেজের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক ও ডিজিটাল আর্টিস্ট মো. আবু লায়েছ নিক্সন। তাঁর নেতৃত্বে শিল্পীরা বড় পরিসরে এসব মুরাল পেইন্টিংয়ের কাজ করছেন।আবু লায়েছ নিক্সন জানান, বগুড়া মহানগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি চিত্রকর্মের মাধ্যমে এ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প ও সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য। দেয়ালের প্রতিটি চিত্রের মাধ্যমে বগুড়ার স্বতন্ত্র পরিচয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বগুড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদুল হক জানান, ফ্লাইওভারের দেয়ালে অনিয়ন্ত্রিত পোস্টার, ব্যানার ও বিজ্ঞাপন লাগানোর কারণে নগরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছিল। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করা এবং শহরের নান্দনিক পরিবেশ বজায় রাখতেই বগুড়ার স্থানীয় পরিচয় তুলে ধরে দৃষ্টিনন্দন ওয়াল আর্ট ও মুরাল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।তিনি বলেন, ফ্লাইওভারের দেয়ালগুলো যেন কেবল কংক্রিটের অবকাঠামো হয়ে না থাকে, বরং বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি উন্মুক্ত শিল্পগ্যালারিতে পরিণত হয়, সেই লক্ষ্যেই সওজের এ উদ্যোগ।নির্বাহী প্রকৌশলী আরও জানান, বর্তমানে বারোপুর ওভারপাসের দেয়ালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, ব্যয় ও সাফল্য বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে বগুড়ার অন্যান্য ওভারপাস, রেল ওভারপাস এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও এ ধরনের নান্দনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সওজ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক-২) প্রকল্পের আওতায় ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনের সংস্থানসহ মহাসড়কটি উন্নীত করা হয়। ২০২৪ সালে শাজাহানপুর উপজেলার বি-ব্লক ক্যান্টনমেন্ট ওভারপাস, ফুলতলা ওভারপাস, ফটকি সেতু, বগুড়া সদরের তিনমাথা মোড়ের রেল ওভারপাস এবং বারোপুর ওভারপাস যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।অবকাঠামোগুলো চালুর পর থেকেই দেয়ালে পোস্টার, ব্যানার, বিজ্ঞাপন ও অননুমোদিত দেয়ালিকা লাগানোর প্রবণতা দেখা দেয়। এতে দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামোর সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের আগস্টে আন্দোলনের সময় এসব দেয়ালে জুলাইয়ের দাবি ও শহীদদের প্রতিকৃতি নিয়ে বিভিন্ন গ্রাফিতি আঁকা হলেও পরবর্তী সময়ে সেগুলোও পোস্টার ও দেয়ালিকার আড়ালে হারিয়ে যায়।এমন পরিস্থিতিতে দেয়ালগুলোকে পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক রাখার পাশাপাশি বগুড়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরতে সওজের এ উদ্যোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ ধরনের শিল্পকর্ম শুধু নগরের সৌন্দর্যই বাড়াবে না, বরং স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটাবে এবং বগুড়ার ঐতিহ্যকে আরও বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরবে।