Joy Jugantor | online newspaper

বগুড়ার ওভারপাসে তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছে ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নিদর্শন

বগুড়ার ওভারপাসে তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছে ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নিদর্শন

 আর কে রেজা 

প্রকাশিত: ২০:৪৮, ৪ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ২০:৪৯, ৪ নভেম্বর ২০২৬

বগুড়ার ওভারপাসে তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছে ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নিদর্শন

বগুড়ার ওভারপাসে তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছে ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নিদর্শন



একসময় পোস্টার, ব্যানার আর দেয়াললিখনে আড়াল হয়ে থাকা বগুড়ার ওভারপাসের দেয়ালগুলো এখন হয়ে উঠছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের চিত্রপট। কংক্রিটের ধূসর দেয়ালে রঙের তুলিতে ফুটে উঠছে মহাস্থানগড়, বেহুলার বাসরঘর, জিয়ত কুণ্ডু, বগুড়ার বিখ্যাত দই, আলু ও লাল মরিচের মতো স্থানীয় ঐতিহ্য। নগরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে বগুড়ার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরতে নেওয়া হয়েছে ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ।বগুড়া মহানগরের চার লেন জাতীয় মহাসড়কের বারোপুর ওভারপাসের উত্তর-পূর্ব পাশের দেয়ালে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে বৃহৎ পরিসরের মুরাল ও ওয়াল আর্টের কাজ। এক্রেলিক রঙে আঁকা এসব চিত্রকর্মে স্থান পাচ্ছে জেলার ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য। ফলে যানবাহনে চলাচলকারী মানুষও পথের পাশে দেখতে পাচ্ছেন বগুড়ার পরিচিতি ও ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ।সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চার লেন জাতীয় মহাসড়কের বগুড়া মহানগর অংশে একটি রেল ওভারপাস ও দুটি ওভারপাস রয়েছে। এর মধ্যে বারোপুর ওভারপাসের দেয়ালে পরীক্ষামূলকভাবে এ চিত্রকর্মের কাজ শুরু হয়েছে।

 উদ্যোগটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল ও কলেজের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক এবং ডিজিটাল আর্টিস্ট মো. আবু লায়েছ নিক্সন। তিনি জানান, নগরের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি শিল্পের মাধ্যমে বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে সবার সামনে তুলে ধরাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম যেন নিজেদের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।সওজ সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক-২) প্রকল্পের আওতায় ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থাসহ মহাসড়কটি উন্নীত করা হয়। ২০২৪ সালে শাজাহানপুর উপজেলার বি-ব্লক ক্যান্টনমেন্ট ওভারপাস, ফুলতলা ওভারপাস, ফটকি সেতু এবং বগুড়া সদরের তিনমাথা মোড়ের রেল ওভারপাস যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এসব অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ২৫৭ কোটি টাকা।

 তবে চালুর পর থেকেই ওভারপাসগুলোর দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের পোস্টার, ব্যানার, বিজ্ঞাপন ও অননুমোদিত দেয়াললিখন দেখা যায়। এতে অবকাঠামোর সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নগরের সামগ্রিক নান্দনিক পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে দেয়ালগুলোতে জুলাই আন্দোলনের দাবি, শহীদদের প্রতিকৃতি ও বিভিন্ন গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেগুলোর অনেকটাই আবার পোস্টার ও দেয়াললিখনের আড়ালে ঢাকা পড়ে।নতুন এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা। তাঁদের মতে, একটি শহরের পরিচয় শুধু তার অবকাঠামোতে নয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপস্থাপনেও ফুটে ওঠে। ওভারপাসের দেয়ালে স্থানীয় ঐতিহ্য তুলে ধরার ফলে নগরের সৌন্দর্য বাড়ার পাশাপাশি বাইরের জেলা থেকে আসা মানুষের কাছেও বগুড়ার পরিচিতি পৌঁছাবে।স্থানীয় এক বাসিন্দা নজরুল ইসলাম  বলেন, আগে ওভারপাসের দেয়ালগুলোতে নানা ধরনের পোস্টার ও বিজ্ঞাপন দেখে বিরক্ত হতে হতো। এখন সেখানে বগুড়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের চিত্র ফুটে উঠছে। এটি শহরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পরিচিতি তুলে ধরার একটি ভালো উদ্যোগ। কাজটি যেন দীর্ঘদিন সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।নিয়মিত ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী  পথচারী রিপন  বলেন, চলার পথে মহাস্থানগড়, বেহুলার বাসরঘর কিংবা বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী দইয়ের ছবি চোখে পড়লে ভালো লাগে। এতে শুধু দেয়াল সুন্দর হচ্ছে না, মানুষও নিজের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন করে জানতে পারছে।

শিক্ষার্থীরাও উদ্যোগটিকে দেখছেন শেখার নতুন সুযোগ হিসেবে। স্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের  শিক্ষার্থী  মরিয়ম বলেন, বইয়ে মহাস্থানগড় ও বগুড়ার ইতিহাস সম্পর্কে পড়েছি। এখন সড়কের পাশের দেয়ালে সেসব বিষয় ছবি আকারে দেখতে পাওয়া আনন্দের। এ ধরনের চিত্রকর্ম দেখে ছোট শিক্ষার্থীরাও নিজেদের জেলার ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহী হবে। তাঁদের মতে, ভবিষ্যতে জেলার অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান, লোকজ সংস্কৃতি ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনচিত্রও দেয়ালে তুলে ধরা যেতে পারে।বগুড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদুল হক বলেন, ওভারপাসের দেয়ালে অনিয়ন্ত্রিত পোস্টার, ব্যানার ও বিজ্ঞাপন লাগানোর কারণে নগরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছিল। এ ধরনের কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করে দেয়ালগুলোকে নান্দনিকভাবে সাজানোর পাশাপাশি বগুড়ার নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরতেই ওয়াল আর্ট ও মুরাল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 তিনি আরও জানান, উদ্যোগটির বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং বগুড়া সদর আসনের সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা অবগত রয়েছেন।নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘ফ্লাইওভারের দেয়ালগুলো যেন শুধু কংক্রিটের অবকাঠামো হয়ে না থাকে, বরং বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি উন্মুক্ত শিল্পগ্যালারিতে পরিণত হয়, সেই লক্ষ্যেই সওজের এই উদ্যোগ।’তিনি দেয়ালে পোস্টার, ব্যানার ও বিজ্ঞাপন না লাগানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বলেন, বারোপুর ওভারপাসে বর্তমানে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর অভিজ্ঞতা, ব্যয় ও সাফল্য পর্যালোচনা করে পর্যায়ক্রমে বগুড়ার অন্যান্য ওভারপাস, রেল ওভারপাস এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও এ ধরনের শিল্পকর্ম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পরিকল্পিতভাবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নগরের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচিতি ছড়িয়ে দেওয়ার নতুন একটি মাধ্যম তৈরি হবে। কংক্রিটের দেয়াল তখন হয়ে উঠতে পারে নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত ইতিহাস ও শিল্পের পাঠশালা।