সারিয়াকান্দিতে সুপার ফুট কিনোয়া চাষে সফল আব্দুল হান্নান
বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে দক্ষিণ আমেরিকার সুপার ফুড কিনোয়া পরীক্ষামূলকচাষে সফল হয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা। নিজে খাওয়ার জন্য চাষ করলেও বাজারে উচ্চ মূল্য থাকায় আগামীতে বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করার স্বপ্ন তার। সারিয়াকান্দি উপজেলায় মাটিতে প্রথম বারের মতো কিনোয়া চাষে সফলতা দেখে গ্রামের অনেকেই চাষের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। উপজেলার পৌর এলাকার দেলুয়াবাড়ী গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বারের ছেলে আব্দুল হান্নান, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের চাকুরী থেকে অবসর নেওয়ার পর নিজের গ্রামের বাড়ীতেই অবস্থান করছেন। বয়সের ভারে শরীরে নানা ধরনের রোগ বাসা বেঁধেছে। ভাত খাওয়ার পরিবর্তে তিনি আমেরিকান সুপার ফুড কিনোয়া খাওয়া শুরু করেন। যা ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ সহ বেশকিছু রোগ নির্মূলে বেশ উপকারী। যা তিনি ঢাকার বিভিন্ন সুপার সপ থেকে অতি উচ্চ মূল্যে সংগ্রহ করতেন। যা প্রতি কেজি তিনি ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত কিনে আনতেন। এতো বেশি মূল্যে ক্রয় করা থেকে বিরত থাকতে তিনি কিনোয়া চাষের স্বপ্ন দেখেন।
পরে ইউটিউব ঘেঁটে তিনি এর চাষপদ্ধতি জেনে, তার বাড়ির পাশে ১২ শতাংশ জমিতে কিনোয়া চাষ করেন। পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করলেও এটি চাষে তিনি সফল হয়েছেন। গত দুমাস আগে বপন করা কিনোয়ার গাছগুলো বেশ বড় হয়েছে এবং এর বীজ পরিপক্ব হয়েছে। তাই পরিপক্ব কিনোয়া তিনি এখন তার জমি থেকে উত্তোলন করা শুরু করেছেন। তিনি আশা করছেন তার ১২ শতাংশ জমিতে প্রায় ৭০ কেজির মতো কিনোয়ার উৎপাদন হবে। যার বাজার মূল্য ১ হাজার টাকা করে কেজি হলেও ৭০ হাজার টাকা। তিনি জানান, ভালো কিনোয়ার ফলন হলে প্রতি বিঘা জমিতে ৭ থেকে ৮ মণ কিনোয়া উৎপন্ন হওয়া সম্ভব। আমেরিকাসহ বেশকিছু দেশের মানুষ কিনোয়া খেতে খুবই অভ্যস্ত। এটা তাদের দেশে প্রচুর পরিমানে উৎপাদন হয়। যা বাংলাদেশ আমদানি করে ঢাকাসহ বিভিন্ন সুপারসপে বেশ উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে।
সাধারণত যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ সহ নানা ধরনের রোগে ভোগেন বা যাদের জন্য ভাত খাওয়া নিষেধ রয়েছে তারা নিঃসন্দেহে কিনোয়া খেতে পারে। এটা এসব রোগীদের জন্য খুবই উপযোগী। এটি সাধারণত বোরোধান এবং আমনধানের মাঝামাঝি সময়ে জমি যখন পতিত হয়ে থাকে, ঠিক সেই সময়ে জমি অলস না রেখে তাতে কিনোয়া চাষ করে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ফসল সংগ্রহ করা যায়। এতে খুবই লাভ হয়। তিনি বলেন, এ বছর খাওয়ার জন্য মাত্র ১২ শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলক চাষ করেছিলাম। মাত্র ১২ শতাংশ জমিতে ভালো লাভ পেয়ে আগামীতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার পরিকল্পনা করছি। আমার চাষ দেখে এবং বাজারে ভালো দামের কথা শুনে অনেকেই আমার কাছে থেকে কিনোয়ার বীজ চেয়েছেন। তারাও আগামী বছর চাষ করবেন।এ গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, হান্নান ভাইয়ের কিনোয়া চাষ আমার খুবই ভালো লেগেছে। বাজারে যেহেতু প্রতিমন কিনোয়া ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা মন বিক্রি হচ্ছে, তাই আগামী বছর আমি আমার বেশকিছু জমিতে কিনোয়ার আবাদ করবো।
সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, এটি একটি লাভজনক ফসল এবং এ উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমবারের মতো চাষ হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে এর আবাদ দিনদিন বৃদ্ধি পাবে। আব্দুল হান্নান কিনোয়া একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর গ্লুটেন-মুক্ত সুপারফুড, যা উচ্চ প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ। এটি ওজন কমাতে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে, এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর। এতে থাকা ৯টি এসেনশিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিড ও খনিজ উপাদান শরীরের শক্তি বাড়ায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। কিনোয়া খাওয়ার মূল উপকারিতাগুলো হলো, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ফাইবার: উচ্চ ফাইবারযুক্ত হওয়ায় কিনোয়া দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে, যা ক্ষুধা কমায় এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে।উচ্চ প্রোটিন ও পুষ্টি: নিরামিষভোজীদের জন্য এটি প্রোটিনের একটি চমৎকার উৎস।
এতে থাকা ৯টি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিড টিস্যু বৃদ্ধিতে সহায়ক।ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত হওয়ায় এটি রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী ।হার্ট সুস্থ রাখে: এটি কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় ।গ্লুটেন-মুক্ত: গ্লুটেন অ্যালার্জি বা সিলিয়াক ডিজিজ আছে এমন ব্যক্তিদের জন্য এটি একটি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার ।খনিজ ও ভিটামিনের উৎস: এতে আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন বি ও ই রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ।ত্বকের উজ্জ্বলতা: অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন বি সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি ত্বকের বলিরেখা দূর করে এবং ত্বক সজীব রাখে ।
