নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি: নাহিদ ইসলাম
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এক স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও দেশে নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম।শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে চার দফা দাবিতে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।নাহিদ ইসলাম বলেন, হাজারো মানুষের রক্তদানের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এক স্বৈরাচারকে বিদায় করা হয়েছে। কিন্তু এখন দেশে নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখা যাচ্ছে। তবে পতিত স্বৈরাচার ও নব্য স্বৈরাচার, দুই স্বৈরাচারকেই পরাজিত করা হবে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘আমরা বিগত এক সপ্তাহ ধরেই আমাদের নেতারা এই ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। মানুষ তাদের সমস্যার কথা বলেছেন। তাদের কাছ থেকে উঠে এসেছে নানা সমস্যা ও দুর্ভোগের চিত্র। বাসাবাড়িতে গ্যাস নেই, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সন্ত্রাস, রাহাজানিতে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবাই ভোগান্তিতে রয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করা হচ্ছে।আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, এই ব্যর্থতার দায় সবচেয়ে বেশি যার ওপর বর্তায়, তিনি হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধনের কাজে ব্যস্ত হয়েছেন।’
সালাহউদ্দিন আহমেদ ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এবং জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন।সেই গণভোটকে বাদ দিয়ে সংবিধান কাটাছেঁড়ার যে দায়িত্ব নিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ, আমরা তার পদত্যাগের দাবিতে আজকে শাহবাগে এসেছি। সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যিনি জ্বালানিমন্ত্রী রয়েছেন, তাকেও পদত্যাগ করতে হবে। কারণ উনারা দুজনই তাদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন।’সংবিধান সংস্কারের জন্য গঠিত একতরফা কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, অবিলম্বে ওই কমিটি বাতিল করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। জুলাই সনদ ও গণভোটের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন। কিন্তু নির্বাচনের পর প্রথম দিন থেকেই বিএনপি সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বিএনপি।
বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদ, ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে সরে যাচ্ছে বিএনপি। আমরা খুব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, বিএনপি সরকারের কাছে জনাব তারেক রহমানের দেশ পরিচালনা করার কোনো ধরনের প্ল্যান-পরিকল্প নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, তাদের প্ল্যান-পরিকল্পনা হয়েছে কীভাবে দেশ থেকে দুর্নীতি করবে, কীভাবে লুটপাট করবে, কীভাবে চাঁদাবাজি করবে, কীভাবে সন্ত্রাস কায়েম করবে, কীভাবে দখলদারত্ব করবে। সেই পরিকল্পনা নিয়ে জনাব তারেক রহমান লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছেন।’
তিনি বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরে শুনছি, পতিত স্বৈরাচার নাকি দেশে আসবে। আমরা জানি, সেই স্বৈরাচারকে এই নতুন স্বৈরাচার কোনোভাবেই মোকাবিলা করতে পারবে না। বিগত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ পারেনি, বিএনপি আওয়ামী লীগ থেকে বাংলাদেশের জনগণকে রক্ষা করতে পারেনি। তারা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি, জনগণকে কীভাবে রক্ষা করবে? ফলে বাংলাদেশের তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জনগণকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মুজিববাদী ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এবং এই দুর্নীতিবাজ মাফিয়া সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে আবারও রাস্তায় নামতে হবে।’
ভারতের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার নানা ধরনের চক্রান্ত চলমান রয়েছে। বাংলাদেশের পাহাড়ে অশান্তি তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের ওপারে আসামে মুসলমানদের নিপীড়ন করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের নিপীড়ন করা হচ্ছে। দিল্লিতে মসজিদ ভেঙে দেওয়া হচ্ছে এবং বাংলাদেশের মুসলমানদের নিয়েও চক্রান্ত করছে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ। বাংলাদেশের হিন্দুদের নিয়েও চক্রান্ত করছে।’সীমান্ত হত্যার প্রসঙ্গে স্বর্ণা দাস ও ফেলানি খাতুনের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও ১০ জনের বেশি বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের যে চক্রান্ত, সেই চক্রান্ত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পারবে না বর্তমান সরকার।’
ভারতের সঙ্গে করিডর ও গঙ্গা চুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি, জাপানে গিয়ে বাংলাদেশকে আবারও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডর তৈরি করার চেষ্টা করছে। অবৈধ করিডর ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশের জনাব তারেক রহমান। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এ ধরনের কোনো অবৈধ করিডর বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না। ডিসেম্বরে যদি গঙ্গা চুক্তি ন্যায্যভাবে নতুন করে তৈরি করা না হয়, তাহলে বাংলাদেশের জনগণ আবারও নামবে। এবার আমরা গঙ্গা চুক্তিতে কোনোভাবেই এক বিন্দু পরিমাণ আমাদের ন্যায্য হিস্যায় ছাড় দেব না।’নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে যে নৈরাজ্য চলমান রয়েছে, খুন, গুম চলছে, এসবকিছুর ব্যর্থতা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে, জ্বালানিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। আমাদের এই মিছিল বড় হবে। সারা বাংলাদেশের সর্বত্রই আমরা মিছিল করব। সেই মিছিল নিয়ে আমরা জনাব তারেক রহমানকে ঘেরাও করে আমাদের দাবি আদায় করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।’
