সংস্কারবিহীন সংসদের প্রথম অধিবেশন ব্যর্থ: রাজপথে লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি নাহিদ ইসলামের
যথাযথ সংস্কার কার্যক্রম শুরু না করেই সংসদের প্রথম অধিবেশন পরিচালনা করে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম। রোববার (৩ মে) কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে আয়োজিত এক জাতীয় কনভেনশনে তিনি এই কঠোর সমালোচনা করেন। 'জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট' শীর্ষক এই কনভেনশনের আয়োজন করে জাতীয় নাগরিক পার্টির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি।সভাপতির বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সংকটগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “গত ১৬ বছর ধরে এবং স্বাধীনতার পর থেকে ৫৫ বছর আমরা যে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য লড়াই করেছি, তা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়েছিল। গত ১৬ বছরও আমরা একই ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি দেখেছি।”
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার মানুষের গণতান্ত্রিক স্বপ্নের সাথে আবারও প্রতারণা করছে।নাহিদ ইসলাম রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য কয়েকটি মৌলিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটা উচ্চ কক্ষ লাগবে। সংবিধানকে চেক দেয়ার জন্য। টু থার্ড মেজোরিটি নিয়ে যাতে কোনো সরকার সংবিধানকে ইচ্ছেমতো কাটাছেডা করতে না পারে। উচ্চ কক্ষের কাজই হবে চেক এন্ড ব্যালেন্স তৈরি করা। সে উচ্চকক্ষ আমরা বলেছি ভোটের অনুপাতে করতে। কারণ আসন অনুপাতে করলে উচ্চকক্ষের কোনো লাভ নেই। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে দলীয় নিয়োগ না হয়, নির্বাচন কমিশন যেন নিরপেক্ষভাবে নিয়োগ দেওয়া যায়, আমাদের পিএসসি দুদক যাতে নিরপেক্ষ হয়, আমরা সেটার জন্য দাবি জানিয়েছিলাম, ঐকমত্যে হয়েছিল। এবং বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ। এ কয়েকটি মৌলিক কথা আমরা বলেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ কয়েকটি সংস্কার হলেই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ হবে না। আমরা এই কয়েকটির কথা বলেছি, ধাপে ধাপে আগানোর জন্য। আমরা বলেছিলাম, এ সংস্কারগুলো করতে হবে সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে। সংশোধনীর মাধ্যমে বিএনপি যে সংস্কার নিয়ে আসুক সেটা টেকসই হবে না। আজকে তারা ক্ষমতায় আছে, চিরকাল কেউ ক্ষমতায় থাকে না। জিয়াউর রহমান ভুল করেছিলেন, বিএনপি যদি তাদের মূলনীতি পরিবর্তন করতে চায়, সংস্কার পরিষদ ছাড়া করলে সেটা কার্যকর হবে না। কারণ এই সংশোধনী যে কেউ বাতিল করতে পারবে। আদালতে যেকোন সময় বাতিল করে দিতে পারে।’নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, ৭২-এর সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ফিরিয়ে আনার পথ উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “বিএনপি বুঝে হোক বা না বুঝে, এই ধারাবাহিকতার ফাঁদে পা দিচ্ছে। এর ফলে জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও 'জুলাই সনদ'-এর প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যাচ্ছে।”
সংসদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত পোষণ করার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা পার্লামেন্টে অনেক নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি যাতে তা ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে থাকে। কিন্তু সরকার যদি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার এড়িয়ে যায়, তবে সংস্কারের পক্ষে ভোট দেওয়া মানুষ বসে থাকবে না। প্রথম অধিবেশনকে সরকার ব্যর্থ করেছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে লড়াই আবারও রাজপথে গড়াবে।”এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের সঞ্চালনায় এই কনভেনশনে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সমাপনী অধিবেশনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপনসহ রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষনেতারা বক্তারা সকলেই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের আহ্বান জানান। তারা মনে করেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হলে দেশ আবারও দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে।
