Joy Jugantor | online newspaper

বৃষ্টি বিলাসের এবার আর সুযোগ নেই, আছে মৃত্যু আতঙ্ক

ফিচার ডেস্ক 

প্রকাশিত: ১৩:৫৮, ৮ জুন ২০২১

বৃষ্টি বিলাসের এবার আর সুযোগ নেই, আছে মৃত্যু আতঙ্ক

ফাইল ছবি।

দোর গোড়ায় বর্ষা। এই সময় যখন তখন বৃষ্টি এই সময় খুবই স্বাভাবিক। তবে এবার বর্ষা শুরুর অনেক আগেই ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে ঘন ঘন বজ্রপাতও। বৃষ্টি বিলাসের এবার আর সুযোগ নেই। বজ্রপাতের আতঙ্কে তটস্থ দেশের মানুষ। প্রাকৃতিক নিয়মেই এসব দুর্যোগের সম্মুখীন আমরা প্রতি বছর হই। তবে এবার ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাতের সংখ্যা অনেক বেশি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঠে-ঘাটে-ছাদে বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা বেড়েছে।

একে মহামারিতে মানুষ জীবন মরণের মাঝখানে দুলছে। অন্যদিকে বজ্রঝড়ে মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে লাশের সংখ্যা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বজ্রপাতের তীব্রতা বেড়েছে। তবে কেন এতো বেড়েছে বজ্রপাত, এই ভাবনা বিশেষজ্ঞদের কপালের ভাঁজ দীর্ঘ হচ্ছে। ‘ইভেন্টের পার্টিকুলার ডে বা শর্ট পিরিয়ডে’ বেশি বজ্রপাত বৈশিষ্ট্য বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিককালে বজ্রপাতের এমন ঘটনাকে ‘শর্ট লিফট লাইটেনিং ফেনোমেনা’ বলা হয়- এর ঘনঘটা বাড়ছে।

বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার একটা অন্যতম কারণ যেমন বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য, তেমনই আর একট কারণ তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া। আর এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত দূষণ। দূষণের মাত্রা যত বাড়ছে, গড় তাপমাত্রা তত বাড়ছে। ফলে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হওয়ার আদর্শ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

বজ্রঝড়ের সময় সাধারণত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট বজ্রপাতের ভয় থাকে। কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি হয়, তখনই বজ্রঝড় হয়ে থাকে। কিউমুলোনিম্বাস মেঘ হচ্ছে খাড়াভাবে সৃষ্টি হওয়া বিশাল আকৃতির পরিচালন মেঘ; যা থেকে শুধু বিদ্যুৎ চমকানো নয়, বজ্রপাত-ভারি বর্ষণ-শিলাবৃষ্টি-দমকা-ঝড়ো হাওয়া এমনকি টর্নেডোও সৃষ্টি হতে পারে।

বায়ুমণ্ডলে বাতাসের তাপমাত্রা ভূ-ভাগের উপরিভাগের তুলনায় কম থাকে। এ অবস্থায় বেশ গরম আবহাওয়া দ্রুত উপরে উঠে গেলে আর্দ্র বায়ুর সংস্পর্শ পায়। তখন গরম আবহাওয়া দ্রুত ঠাণ্ডা হওয়ায় প্রক্রিয়ার মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে বজ্রমেঘের সৃষ্টি হয়।

কিন্তু বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাও কেন এত বাড়ছে? আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দেখা যাচ্ছে শহরের থেকে গ্রামীণ এলাকায় বজ্রপাতে মৃত্যু বেশি হচ্ছে। ফাঁকা মাঠে চাষের কাজ করতে গিয়ে মৃত্যু হচ্ছে অনেকের। এর অন্যতম কারণ কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার করা উন্নত যন্ত্রপাতি। বর্তমানে চাষের কাজে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেশি হয়। আর এই সব যন্ত্রে বিদ্যুৎ আকর্ষিত হয়। সেই সঙ্গে ফাঁকা মাঠে কোনও উঁচু জায়গা না থাকায় মানুষের উপর বজ্রপাতের ঘটনা অনেক বেশি হচ্ছে।

বজ্রপাতের এ দুর্যোগে প্রাণহানি ও আহত হওয়া ঠেকাতে মানুষের সচেতনতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। 

>> বজ্রপাত হলে উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বিদ্যুৎস্পর্শের সম্ভাবনা বেশি থাকে। বজ্রপাতের সময় পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নিতে এবং উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকতে হবে। 

>> এ সময় জানালা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি ধাতব বস্তু এড়িয়ে চলা, টিভি-ফ্রিজ না ধরা, গাড়ির ভেতর অবস্থান না করা এবং খালি পায়ে না থাকারও পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

>> বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। এ সময় বিদ্যুৎ অপরিবাহী রাবারের জুতা সবচেয়ে নিরাপদ।

>> ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোনো অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না। পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নেয়াই সুরক্ষার কাজ হবে।  

>> বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করা যাবে না। এমনকি ল্যান্ড লাইন টেলিফোনও স্পর্শ করা যাবে না।

>> এই সময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ করা থাকলেও ধরা যাবে না। চালু থাকলে বন্ধ করে দিতে হবে, নইলে নষ্ট হয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। বজ্রপাতের আভাস পেলে প্লাগ খুলে এগুলো বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে হবে।

>> বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভেতরে থাকলে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। গাড়ির ভেতরের ধাতব বস্তু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

>> এমন কোনো স্থানে যাওয়া যাবে না যে স্থানে নিজেই ভৌগলিক সীমার সবকিছুর উপরে। এ সময় ধানক্ষেত বা বড় মাঠে থাকলে তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে যেতে হবে। বাড়ির ছাদ কিংবা উঁচু কোনো স্থানে থাকলে দ্রুত সেখান থেকে নেমে যেতে হবে।

>> বজ্রপাতের সময় নদী, জলাশয় বা জলাবদ্ধ স্থান থেকে সরে যেতে হবে। জল বিদ্যুৎ পরিবাহী তাই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

>> বজ্রপাতের সময় কয়েকজন জড়ো হওয়া অবস্থায় থাকা যাবে না। ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে সরে যেতে হবে। কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে যাওয়া যেতে পারে।

>> যদি বজ্রপাত হওয়ার উপক্রম হয় তাহলে কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসে চোখ বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু এ সময় মাটিতে শুয়ে পড়া যাবে না। মাটিতে শুয়ে পড়লে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।

কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাত শুরুর অন্তত আধ ঘণ্টা সময় সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ঊর্ধ্বাকাশে এখন প্রচুর জলীয় বাষ্প রয়েছে। এ সময় উত্তর থেকে ঠাণ্ডা হাওয়াও ধাবমান। একদিক থেকে গরম ও আর্দ্র হাওয়া আর অন্য দিক থেকে ঠাণ্ডা বাতাস- এমন পরিস্থিতে বজ্রপাতের ঘটনাই স্বাভাবিক, যা কয়েক ঘণ্টার স্বল্প সময়ের মধ্যে তীব্র রূপ নেয়।

সাধারণত মার্চ-এপ্রিল মাসে বজ্রপাতের প্রবণতা দেখা যায়। সেই সঙ্গে মৌসুমগত আবহাওয়ার পবির্তনের সময়েও বজ্রপাতের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। এ জন্যে জুন-জুলাইয়েও বজ্রপাতের বড় ঘটনা ঘটে থাকে।