Joy Jugantor | online newspaper

মৃত্যু: মহাজাগতিক রূপান্তর ও পরম গন্তব্য

লেখক:লেখক: সমাজ ও উন্নয়ন কর্মী, মো: আতোয়ার হোসেন

প্রকাশিত: ১৮:৪৫, ৯ অক্টোবর ২০২৬

মৃত্যু: মহাজাগতিক রূপান্তর ও পরম গন্তব্য

মৃত্যু: মহাজাগতিক রূপান্তর ও পরম গন্তব্য

আজকের নিশিরাতের নিস্তব্ধতায় কিংবা কোনো ব্যস্ত নগরীর মোড়ে যখন হঠাৎ অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজতে থাকে, তখন আমাদের অবচেতন মন কি এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায়? মানবজীবনের সবচেয়ে বড় অজানা ভয়, আবার সবচেয়ে বড় অলঙ্ঘনীয় সত্যের নাম—'মৃত্যু’।

চিকিৎসাবিজ্ঞান সাধারণত মৃত্যুকে দেখে রক্তসঞ্চালন ও মস্তিষ্কের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার মাধ্যমে জৈবিক অবসানের সূচক হিসেবে। কিন্তু আত্মদর্শী সাধক, নিউরোসাইন্স এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের চোখে মৃত্যু কোনো মেকানিক্যাল সমাপ্তি নয়—বরং এটি পরম সত্যের আলোয় নিজেকে চেনার এক মহাজাগতিক ও মাত্রাভিত্তিক রূপান্তর।

ইতিহাসের বিশাল মিছিল ও ক্ষণস্থায়ী ধরণী একটু হিসাব করে দেখলে শিউরে উঠতে হয়—সৃষ্টির সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত এই ধরণীতে প্রায় ১১ থেকে ১২ হাজার কোটি মানুষ এসেছিল। সেই মানবসমুদ্রের তুলনায় আমরা আজ যারা বেঁচে আছি, তারা মহাসাগরের একফোঁটা জলের মতোই ক্ষণস্থায়ী। আমাদের আগে আসা সেই কোটি কোটি মানুষ আজ কোথায়?

আমাদের পূর্বসূরিদের দৈহিক উপাদান আজ প্রকৃতির ধূলিকণায় লীন, আর তারা অবস্থান করছেন 'বরজখ' বা অন্তর্বর্তী এক জগতে, পরম করুণাময়ের চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায়। বিশ্ববিখ্যাত পার্সিয়ান কবি শেখ সাদী তাঁর কালজয়ী রচনায় লিখেছিলেন—“মৃত্যুর দূত যখন ডাক দেবে, তখন সুফীর ছেঁড়া জোব্বা আর সুলতানের হীরেখচিত মুকুট—উভয়ই একই ধূলিতে মিশে একাকার হয়ে যাবে।” এই প্রজ্ঞা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আজ যা তোমার, কাল তা অন্য কারো ছিল, পরশু তা অন্য কারো হয়ে যাবে।

কোয়ান্টাম ফিজিক্স, নিউরোসাইন্স ও তথ্যের অমরত্ব গবেষক জাকারিয়া কামালের বিজ্ঞানভিত্তিক তাফসীর, গবেষক নোবেল বিজয়ী রজার পেনরোজের Orch-OR Theory এবং আধুনিক কোয়ান্টাম মেকানিক্স মৃত্যুকে কোনো বিলুপ্তি হিসেবে দেখে না। আধুনিক নিউরোসাইন্স এখন বলছে, মানুষের মস্তিষ্ক কোনো চেতনা তৈরি করে না, বরং মস্তিষ্ক রেডিও অ্যান্টেনার মতো মহাজাগতিক চেতনাকে রিসিভ করে। অ্যান্টেনা ভাঙলেই যেমন গান বন্ধ হয়ে যায় না, তেমনি দেহ বা ব্রেন-ডেথ হলেও চেতনা ধ্বংস হয় না।

কোয়ান্টাম ফিজিক্সের 'ইনফরমেশন কনজারভেশন' (তথ্য সংরক্ষণের আইন) অনুযায়ী—মহাবিশ্বে কোনো তথ্য বা চেতনাই কখনো হারিয়ে যেতে পারে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক গবেষণায় ‘নিয়ার-ডেথ এক্সপেরিয়েন্স’ (NDE) নিয়ে হার্ভার্ডের নিউরোসার্জন ড. ইবেন অ্যাললেকজান্ডারের সত্য ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে—যেখানে দেখা যায় দৈহিক মৃত্যুর পর চেতনা এক উচ্চতর ও আলোকময় ডাইমেনশনে প্রবেশ করে। কোরআনে যেভাবে আঙ্গুলের অগ্রভাগসহ (Fingerprints) মানুষের নিখুঁত পুনর্গঠন ও মৃত্যুর পর নতুন অবয়বে পুনরুত্থানের সংকেত দেওয়া হয়েছে, বিজ্ঞানের এই আধুনিক আবিষ্কারগুলো মূলত সেই পরম আধ্যাত্মিক সত্যেরই প্রতিধ্বনি।

আধুনিক সভ্যতার রঙিন হাতছানি ও সর্বজনীন বিস্মৃতি আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটালাইজেশন কিংবা আধুনিক বৈষয়িক সভ্যতার চটকদার রঙিন হাতছানিতে কেবল তরুণ সমাজ নয়, বরং সব বয়সের মানুষই আজ মোহগ্রস্ত। তরুণরা যেমন স্ক্রিনের অলীক জগত, লাইক-কমেন্ট আর কৃত্রিম আনন্দের পেছনে ছুটছে; তেমনি প্রবীণরা ব্যস্ত অর্থ-বিত্তের পাহাড় গড়া ও সামাজিক পদের অন্ধ প্রতিযোগিতায়। লিও টলস্টয় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য ডেথ অব ইভান ইলিচ’-এ দেখিয়েছিলেন কীভাবে মানুষ সারা জীবন সামাজিক মর্যাদা আর অর্থের পেছনে ছুটে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অনুশোচনা করে যে, সে আসল জীবনটাই বাঁচেনি।

বর্তমান সভ্যতার চাকচিক্য আমাদের এমন এক অপসংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করে তুলেছে যেন এই পার্থিব জগতের আরাম-আয়েশই চূড়ান্ত। আমরা ভুলে যাচ্ছি—আজ যে আঙুল দিয়ে আমরা আধুনিক প্রযুক্তি পরিচালনা করছি, তা একদিন নিথর ও অবশ হয়ে যাবে। এই সর্বজনীন বিস্মৃতি মানুষকে তার মূল আত্মিক অস্তিত্ব ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

মৃত্যু যখন পরম উৎসব: ওশো, রুমি ও তাব্রিজীর অধ্যাত্ম আলো মৃত্যু সম্পর্কিত প্রচলিত ভয়কে চুরমার করে দিয়ে আধ্যাত্মিক গুরু ওশো এক যুগান্তকারী সত্য উন্মোচন করেছেন। ওশোর মতে, মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় কারণ সে নিজেকে তার নশ্বর শরীর এবং কৃত্রিম অহংকারের (Ego) সাথে গুলিয়ে ফেলে। তিনি বলেন, মানুষ জন্ম থেকেই মৃত্যুর দিকে হাঁটছে, কিন্তু জীবনকে যে ভালোবাসতে জানে, তার কাছে মৃত্যু কোনো অন্ধকার নয়—বরং চরম এক আনন্দ উৎসব। ওশো ব্যাখ্যা করেছেন, একটি ক্ষুদ্র নদী যেমন মহাসাগরে পতিত হয়ে নিজের সংকীর্ণ অস্তিত্ব বিলীন করে নিজেই মহাসাগরে রূপ নেয়, মৃত্যুও ঠিক তেমনি মানুষকে তার ক্ষুদ্র 'আমিত্ব' থেকে মুক্তি দিয়ে অনন্তর সাথে এক করে দেয়। ওশোর ভাষায়: "যে সত্যি সত্যি বাঁচতে জানে, তার কাছে মৃত্যু কোনো শোকের সংবাদ নয়, বরং তা জীবনের শ্রেষ্ঠ নৃত্য।"

একইভাবে সুফীবাদের সুউচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি এবং তাঁর মুর্শিদ শামস তাব্রিজী মৃত্যুকে পরম প্রেমিকের মিলন হিসেবে দেখেছেন। গুরু শামস তাব্রিজীর সেই অমর বাণী—“নতুন জীবনে পুনর্জন্ম লাভ করতে হলে তোমাকে মৃত্যুর আগেই আত্মিক মৃত্যুবরণ করতে হবে । এর অর্থ হলো, জীবদ্দশাতেই নিজের অহংকার, লোভ, হিংসা ও আসক্তির মৃত্যু ঘটানো।

গুরু তাব্রিজীর প্রজ্ঞায় দীক্ষিত হয়ে রুমি মৃত্যুকে কোনো শোক বা বিচ্ছেদ হিসেবে না দেখে তাকে বলতেন 'শব-ই-উরুস'—অর্থাৎ পরম সত্তার সাথে মিলনের আনন্দরাত। রুমি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন: "মৃত্যুর সময় আমার জানাজায় কেঁদো না, কারণ এটা কোনো বিচ্ছেদ নয়; এটা তো পরম প্রেমিকের ঘরে ফিরে যাওয়ার পরম রাত।"

ঠিক একই সুফী ও বাউল ধারায় বাংলার মরমি সাধক লালন শাহ তাঁর গানে দেহের ক্ষণস্থায়িত্ব প্রকাশ করেছিলেন: “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়” । বাউল দর্শনে দেহ নশ্বর, কিন্তু ভেতরের ‘অচিন পাখি’ বা পরমাত্মা অবিনাশী।

ভেতরের শূন্যতা ও বহুমাত্রিক চেতনার উন্মোচন আধ্যাত্মিক সাধনার গভীরে প্রবেশ করলে অনুধাবন করা যায়, মৃত্যুকে উপলব্ধি করার প্রথম পাঠ হলো নিজের ভেতরে এক গভীর 'শূন্যতা' তৈরি করা। পার্থিব আসক্তি ও মেকি অহংকার ধ্যানের আলোয় খালি করে দেওয়াই হলো এই অন্তরের শূন্যতা। যার ভেতরের পাত্রটি আগে থেকেই খালি, মৃত্যুর সময় তার কোনো কিছু হারানোর বেদনা থাকে না। তখন মৃত্যু কোনো বিনাশ হয়ে আসে না, বরং তা চেতনার ভিন্ন ভিন্ন ডাইমেনশনে (Dimensions of Existence) বিচরণ করার এক অপার মহাজাগতিক সুযোগ তৈরি করে দেয়। পার্থিব ত্রিমাত্রিক জগতের সীমাবদ্ধ দেহ-খাঁচা খসে পড়লে আত্মা মুক্ত হয়ে উচ্চতর মাত্রায় পরম সত্তার সাথে যুক্ত হয়।

ধর্মীয় অনুশাসন ও পরম জবাবদিহিতা বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো মৃত্যুকে জীবনের চূড়ান্ত সমাপ্তি না দেখে দায়বদ্ধতার এক নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখে। ইসলাম ধর্মে পার্থিব জীবনকে ক্ষণস্থায়ী পরীক্ষাক্ষেত্র বলা হয়েছে, যেখানে আখেরাতের জবাবদিহিতা মানুষকে অন্যায়, দুর্নীতি ও পাপচার থেকে বিরত রাখে।

মৃত্যুকে জয় করার দৈনন্দিন চর্চা হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে নিজের নফস বা অহংকারকে দমন করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে।" রাতে ঘুমানোর আগে নিজের দৈনিক কাজের আত্মপর্যালোচনা বা হিসাব নেওয়া উচিত, যাতে অন্তিম যাত্রার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি সহজ হয়। একইসাথে বর্তমান মুহূর্তকে পূর্ণতায় যাপন করা এবং যে কোন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করা প্রয়োজন।

মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়, এক নতুন গন্তব্যে পদার্পণ মৃত্যুকে কোনো শোকের অধ্যায় কিংবা ভীতিপ্রদ সমাপ্তি হিসেবে না দেখে, এক অনন্ত সফরের আলোকোজ্জ্বল দুয়ার হিসেবে দেখাই শ্রেয়। এটি কেবল মাটির দেহরূপ পোশাকটি খসিয়ে ক্ষণস্থায়ী জগত থেকে পরম সত্তার নির্ধারিত স্থায়ী ঠিকানার দিকে পদার্পণ মাত্র।

লালন, রুমি ও তাব্রিজীর অধ্যাত্ম প্রেম, ওশোর ছকভাঙা প্রজ্ঞা, জাকারিয়া কামালের কোয়ান্টাম তাফসীর, নিউরোসাইন্সের আধুনিক সত্য, বিশ্বসাহিত্যের শিক্ষা কিংবা ইসলামের পরম জবাবদিহিতার আলোই পারে আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তুলতে। আমাদের সবাইকে এই সত্যটি হৃদয়ঙ্গম করতে হবে যে, মেকি দুনিয়ার অনিত্যতার ভিড়ে পরম সত্য লুকিয়ে আছে আমাদের মানবিক দায়িত্ববোধে। ক্ষণভঙ্গুর অহংকার দূরে ঠেলে সত্য, ন্যায় ও ভালোবাসায় জীবনকে সাজাতে হবে—যেন ইহকালের সংক্ষিপ্ত অনুচ্ছেদে একটি অর্থবহ ভূমিকা রেখে পরম তৃপ্তি ও ঈমানী দৃঢ়তায় স্রষ্টার নির্ধারিত সেই চিরন্তন গন্তব্যে সফলভাবে পৌঁছানো যায়।