Joy Jugantor | online newspaper

শতবর্ষী ঐতিহ্যের সাক্ষী মহাদেবপুরের হুর মেলা,

মানুষের মিলনমেলায় কোটি টাকার বেচাকেনা

নওগাঁ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২:০৯, ৭ জুন ২০২৬

মানুষের মিলনমেলায় কোটি টাকার বেচাকেনা

মহাদেবপুরে ঐতিহ্যবাহী গ্রমীণ হুর মেলা

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার চেরাগপুর ইউনিয়নের চেরাগপুর গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ হুর মেলা। দিনব্যাপী এ মেলায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি মেলা নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতি ও পারিবারিক বন্ধনের এক অনন্য মিলনমেলা।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘হুর’ শব্দটি কোনো রমণীকে নির্দেশ করে না। গ্রামের বটগাছতলায় অবস্থিত একটি প্রাচীন মাজারকে কেন্দ্র করে সকালে মেলা শুরু হয়ে সন্ধ্যায় শেষ হয় বলেই এটি ‘হুর মেলা’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।চেরাগপুর গ্রামের পুকুরপাড়ে একটি বটগাছের নিচে মাটির তৈরি ঘরের ভেতরে রয়েছে মাজার ও মণ্ডপ। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে মানত করেন। মানত পূরণ হলে অনেকে মাজারে এসে রান্না করে আগতদের মাঝে খাবার বিতরণ করেন। আবার অনেক পরিবার দলবেঁধে এসে রান্না করে আনন্দ ভাগাভাগি করেন।প্রতি বছর বাংলা নববর্ষের পর দ্বিতীয় রবিবার এ মেলা অনুষ্ঠিত হলেও এবার জ্যৈষ্ঠ মাসের একটি রবিবারে আয়োজন করা হয়েছে।

কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলে ধান কাটা-মাড়াই শেষে ফাঁকা মাঠে বসে ঐতিহ্যবাহী এই মেলা। স্থানীয়দের মতে, এটি শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করে আসছে।মেলায় বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন, খেলনা, কসমেটিকস, গৃহস্থালি সামগ্রী, কাঠের আসবাবপত্রসহ প্রায় দুই শতাধিক দোকান বসে। এছাড়া মৌসুমি ফল, বড় আকারের রুই, কাতলা ও পাঙ্গাস মাছ, মহিষ ও খাসির মাংস বিক্রিরও বিশেষ আয়োজন থাকে। কাঠের আসবাবপত্রের কিছু দোকান মেলা শেষ হওয়ার পরও কয়েকদিন ব্যবসা চালিয়ে যায়।স্থানীয়রা জানান, হুর মেলাকে ঘিরে আশপাশের অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ এখানে জড়ো হন। অনেক পরিবার মেয়ে-জামাই ও আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করে নিয়ে আসে। ফলে একদিনের জন্য পুরো গ্রামজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।মাজারের খাদেম শুকচান সরদার বলেন, “বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এখানে মানত করেন। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলে তারা এসে রান্না করে সবাইকে খাওয়ান।

শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এ ঐতিহ্য চলে আসছে।”মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন জানান, “সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার দই, মিষ্টি ও জিলাপি বিক্রি হয়েছে। দিন শেষে বিক্রি আট লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি। গত বছরও প্রায় নয় লাখ টাকার বিক্রি হয়েছিল।”মেলা কমিটির আহ্বায়ক হুমায়ন কবির বলেন, “এটি একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মেলা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সমাগম ঘটে। বড় বড় মাছ বিক্রি হয়, মহিষ ও ছাগল জবাই করা হয়। প্রায় দুই শতাধিক দোকানে দিনব্যাপী প্রায় কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। একদিনের জন্য পুরো এলাকা মিলনমেলায় পরিণত হয়।”গ্রামীণ সংস্কৃতি, সামাজিক সম্প্রীতি ও স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্যের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আজও টিকে আছে মহাদেবপুরের ঐতিহ্যবাহী হুর মেলা।