বগুড়ায় হতে যাচ্ছে চার লেনের ৫ টি মহাসড়ক
বগুড়ার সাথে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার সড়ককে চারলেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। মাঠ জরিপের মাধ্যমে প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই ও ব্যয় নিরূপণের পর নেয়া হবে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া।বগুড়ার একাধিক সংসদ সদস্য সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রনালয়ে আধা সরকারিপত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন। এসব আধা সরকারিপত্র নিয়ে সড়ক ও জনপথ ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
বগুড়া-সারিয়াকান্দি ও মোকামতলা-সারিয়াকান্দি চার লেন
বগুড়া থেকে গাবতলী হয়ে সারিয়াকান্দির রাস্তাকে চার লেনের আঞ্চলিক মহাসড়কে উন্নীত করার প্রস্তাব উঠেছে। একই সাথে সারিয়াকান্দি পৌর বাইপাস সড়কও নির্মাণ হবে। প্রায় ২২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বগুড়া থেকে সারিয়াকান্দি এই সড়কটি কয়েক বছর আগে প্রসস্ত করা হয়েছে। এখন সেটি চার লেনের মহাসড়কে রূপ নেবে।সম্প্রতি বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনের সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম এই মহাসড়কের প্রস্তাব দিয়েছেন। এই প্রস্তাবে আরও একটি রাস্তাকে চার লেনে উন্নীতের প্রস্তাব দিয়েছেন। সেটি হলো মোকামতলা থেকে সোনাতলার তেকানী হয়ে সারিয়াকান্দি পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক।চলতি মাসের ৪ মে এই রাস্তাদুটির প্রয়োজনী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য মন্ত্রনালয়ে চিঠি দেয়া হয়। বুয়েটের ব্যুরো অফ রিসার্চ, টেস্টিং এন্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি) বিভাগ থেকে সমীক্ষা যাচাইয়ের জন্য অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
জেলা সড়ক ও জনপথ (সওজ) এবং স্থানীয় সূত্র জানায়, সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের একটি পরিকল্পনা নিয়ে সমীক্ষা জরিপ চলছে। এই সেতু হলে স্বাভাবিকভাবে বগুড়া-সারিয়াকান্দি পথে যাতায়াত বাড়বে। এই লক্ষ্যে রাস্তাটি চার লেনের মহাসড়ক হিসেবে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।একই ধারাবাহিকতায় মোকামতলা থেকে সারিয়াকান্দির সংযোগ সড়ককে উন্নত করতে চাইছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। এই পথের সোনাতলা এলাকাটি যমুনা নদীর পশ্চিমে এবং নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল এলাকা। সেখান থেকে সারিয়াকান্দি পর্যন্ত সড়কটি প্রায় পুরোটাই যমুনা নদীর ডান তীরের বাঁধের ওপর দিয়ে। এই পথ দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা চলাচল করেন।
বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়ক
বৃহস্পতিবার (৭ মে) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম তিনটি মহাসড়কের উন্নয়নে ডিও লেটার দিয়েছেন। এর মধ্যে বগুড়ার চারমাথা থেকে নওগাঁকে জাতীয় মহাসড়ক হিসেবে উন্নীতকরণের উদ্যোগ নেয়াহয়েছেএর সঙ্গে প্রস্তাবিত বগুড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও বিমানঘাঁটির কার্যক্রমের সুবিধার্থে যুক্ত থাকবে বিশেষ সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস লেন। এই সড়কের আনুমানিক দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছে ৪০ কিলোমিটার। এই পথে নওগাঁ, রাজশাহী, জয়পুরহাটের একাংশ মানুষের নিত্যদিনের চলাচল। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে এ পথের গুরুত্ব আরও বাড়বে।এর আগে ২০১৮ সালে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়ক ১৮ ফুট থেকে ২৪ ফুটে প্রশস্তকরণের কাজ হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ২০০ কোটি টাকায় উত্তরাঞ্চলের চারটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততা উন্নীতকরণে একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে বগুড়া-নওগাঁ সড়কটি একটি।
বগুড়া থেকে জয়পুরহাট পথে দুটি চার লেনের মহাসড়ক
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সড়ক উন্নয়নে আরও দুটি ডিও লেটার দিয়েছেন। মোকামতলা-হিলি চার লেন এবং বগুড়ার বারোপুর থেকে জয়পুরহাট চার লেন।২০১৮ সালে বগুড়ার মোকামতলা থেকে জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়ক ২৪ ফুট প্রশস্ত করা হয়। এবার এই সড়কটি হিলি স্থলবন্দর পর্যন্ত চার লেনে রূপান্তর করার প্রস্তাব এসেছে। প্রায় ২৬ কিলোমিটার এই সড়কটি নির্মাণ হলে হিলি বন্দর দিয়ে এই অঞ্চলে পন্য আনা-নেয়া আর বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।বগুড়ার বারপুর এলাকা থেকে জয়পুরহাটে যাওয়ার আরেকটি রাস্তা চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটিকে পুরাতন দিনাজপুর রোডও বলা হয়। বারোপুর থেকে শুরু হয়ে নামুজা ও ক্ষেতলাল হয়ে জয়পুরহাট পর্যন্ত প্রায় ২৬ কিলোমিটার এ সড়কটিকেও চার লেনে প্রশস্ত করতে ডিও লেটার দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
চার লেন হবে বগুড়ার দ্বিতীয় বাইপাস
বগুড়া শহরে যানযটের চাপ কমাতে ২০০৫ সালে মাটিডালী থেকে বনানীর বেতগাড়ী পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার একটি বাইপাস মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন বিএনপি সরকার। এট জাতীয় মহাসড়ক। প্রথম দফায় প্রায় ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে আরও প্রায় ৩ কোটি টাকা যোগ করতে হয়। এবার সেই রাস্তা চার লেন করার প্রস্তাব দিয়েছেন বগুড়া-৭ আসনের (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টন।বগুড়া জেলার সড়ক বিভাগ জানিয়েছে এই রাস্তাগুলোর প্রশস্তকরণের সম্ভাবনা রয়েছে। সেগুলো নিয়ে তারা কাজও করছেন। সওজের উপসহকারী প্রকৌশলী মাহবুব আলম জানান, ৫ সড়ককে চার লেনে উন্নীতের প্রস্তাব আছে। সব মিলিয়ে আনুমানিক ১৮০ কিলোমিটার রাস্তা হবে। এটি পরে কম-বেশি হতে পারে।
প্রকল্প ব্যয় নিরুপনের আগে রাস্তার সম্ভাব্যতা ও মান সমীক্ষার জন্য প্রয়োজন জরিপ গবেষণা। সেই কাজের অনুমতির অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে জানিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদুল হক বলেন, বগুড়া থেকে সারিয়াকান্দি, সোনাতলা উপজেলা যাতায়াতের রাস্তা দুটি চারলেনের উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় যমুনা সেতুর যে কথা হচ্ছে সেটির জন্য অবশ্যই বগুড়া-সারিয়াকান্দি সড়ক চার লেন করতে হবে। অনুমতি পেলেই বুয়েটের গবেষকরা সমীক্ষা চালাবে। তাদের জরিপের ওপর ভিত্তি করে আমরা প্রকল্পের কাজ শুরু করব।এই সড়কগুলো নির্মাণ হলে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে, ফলে এখানকার অর্থনীতিতে গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে বলে যোগ করেন সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী।সড়কগুলোর এমন উন্নয়নকে স্থানীয়রা নিজেদের জন্য আশির্বাদ হিসেবে দেখছেন। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নেপালতলী এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. সোহেল রানা আকন্দ বলেন, যদি সেতু হয় আর রাস্তা চার লেন করে, তাহলে আমাদের এখানে ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও বাড়বে। এমনিতেই নদী পাড় হয়ে জামালপুরের প্রচুর লোক বগুড়ায় আসে। এখান থেকেও ওদিকে যায়।
এই চলাচল আরও সহজ হবে। সময় কম লাগবে। এটা ব্যবসায়িদের জন্য সুখবর। দুপচঁচিয়া সিও অফিস এলাকার বাসিন্দা গোলাম মুক্তাদির জানান, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কাছে হওয়ার কারণে আমাদের এলাকায় আমূল পরিবর্তন আসছে। ফলে এই সময় বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়ক চার লেন করা যথাযথ সিদ্ধান্ত।বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনের সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা সারিয়াকান্দিতে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করছি। এ কারণে বগুড়া-সারিয়াকান্দি ও মোকামতলা-সারিয়াকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে করা প্রয়োজন। এর ফলে অন্তত কোটি মানুষ সুফল ভোগ করবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। কৃষকদের জন্যও সুফল আনবে। মূল কথা আমরা আশা করছি এটি এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে বৃহৎ আকারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
