সারিয়াকান্দিতে এসএসসি ২০২৬ ফলাফলের শোচনীয় চিত্র
বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। উপজেলার মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফলাফল বিশ্লেষণে শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্যের হার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষক সংকট, প্রাইভেট ও নোট-গাইড নির্ভরতা এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, সারিয়াকান্দি উপজেলার ২৯ টি মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় মোট ২ হাজার ৪০৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছে ১ হাজার ৪৮৯ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ৯১৭ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০৭ জন শিক্ষার্থী।অন্যদিকে উপজেলার ১৩ টি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয় ২৯৭ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছে ১৪৬ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ১৫১ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১ জন।এছাড়া ৪ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কারিগরি শাখা থেকে এসএসসি সমমান পরীক্ষায় ২৪৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে ১৭২ জন কৃতকার্য, ৭৪ জন অকৃতকার্য এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ জন।সারিয়াকান্দি উপজেলার ২৯ টি বিদ্যালয়ের মাঝে ৪ টি বিদ্যালয় ফলাফলে এগিয়ে আছে সেগুলো হলো, ফুলবাড়ি গমীর উদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজ, মথুরা পাড়া বি,কে উচ্চ বিদ্যালয়, সারিয়াকান্দি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়।
ফুলবাড়ি গমীর উদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজের ১৪৪ জন পরীক্ষার্থীর মাঝে কৃতকার্য হয়েছে ১১৭:, জন, অকৃতকার্য হয়েছে ২৭ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ জন। মথুরা পাড়া বি, কে উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৬৭ জন পরীক্ষার্থীর মাঝে কৃতকার্য হয়েছে ১৩১ অকৃতকার্য হয়েছে ৩৬ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৭ জন। সারিয়াকান্দি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০৭ জন পরীক্ষার্থীর মাঝে কৃতকার্য হয়েছে ৮৪ জন, অকৃতকার্য হয়েছে ২৩ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ জন।অপরদিকে এই উপজেলার যে ৩ তিনটি বিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি ফল বিপর্যয় হয়েছে সেগুলো হলো, চালুয়াবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, ছাগল ধরা উচ্চ বিদ্যালয়, ছাইহাটা কেএম উচ্চ বিদ্যালয়। চালুয়াবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৫৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছে ১৩ জন অকৃতকার্য হয়েছে ৪১ জন জিপিএ-৫ শুন্য এ গ্রেড শুন্য। ছাগলধরা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৫৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৭ জন অকৃতকার্য হয়েছে ৩৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ জন। ছাইহাটা কেএম উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছে ৩৭ জন, অকৃতকার্য হয়েছে ৬২ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছে শুন্য। ফলে প্রতিষ্ঠানট গুলোর অকৃতকার্যের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এসব ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে পাঠদান করার কথা থাকলেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি দিয়ে দেয়।এছাড়া শ্রেণী কক্ষে পাঠদানের পরিবর্তে শিক্ষকদের একটি অংশ প্রাইভেট পড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণী কেন্দ্রিক শিক্ষার পরিবর্তে প্রাইভেট ও কোচিং নির্ভরতা বাড়ছে।নতুন কারিকুলাম ও আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি সম্পর্কে কিছু শিক্ষকের দক্ষতার ঘাটতি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের পর্যাপ্ত তদারকি না থাকাকেও ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় সারিয়াকান্দি মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে কি না, শিক্ষকরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়ন হচ্ছে কি না এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
অভিভাবকদের অনেকেই বলছেন, পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার কারণ খুঁজলে হবে না; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষা প্রশাসনের নজরদারিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।সারিয়াকান্দি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার পালের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, আমরা সব বিদ্যালয়ের প্রধানের নিয়ে মিটিং করেছি। আমাদের কোথায় সমস্যা আছে সেগুলো চিহ্নিত করছি। অভিভাবক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আন্তরিক হতে হবে। তাহলেই উপজেলার শিক্ষা ব্যাবস্হায় পরিবর্তন আসবে।শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতে, এবারের ফলাফল সারিয়াকান্দি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। অকৃতকার্যের কারণ নিরপেক্ষভাবে চিহ্নিত করে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ, শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকর তদারকি জোরদার করা না হলে আগামী বছরগুলোতেও ফলাফল বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকে যাবে।
