Joy Jugantor | online newspaper

বগুড়ার দীর্ঘতম নদী

আবারো প্রাণ ফিরে আসছে বাঙ্গালী নদীতে

খালিদ বিন সাঈদ

প্রকাশিত: ১১:৫৭, ৯ নভেম্বর ২০২১

আপডেট: ১৬:০৩, ৯ নভেম্বর ২০২১

আবারো প্রাণ ফিরে আসছে বাঙ্গালী নদীতে

সম্প্রতি তোলা ছবি

আজকের বাঙ্গালী নদী যেখানে দেখা যায় ৫০ বছর আগে তার অবস্থান ছিল আরও অনন্ত এক কিলোমিটার পূর্ব দিকে। তখন তো চৈত্র মাসেও নদীতে ভরা পানি থাকতো। নদীই ছিল এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকার মূল উৎস। তেমনি বিনোদনেরও উৎস ছিল বাঙ্গালী। 

বাঙ্গালী বগুড়ার সবচেয়ে দীর্ঘতম নদী। সাপের মত এঁকেবেঁকে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা এই নদীকে নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন বগুড়ার ধুনট উপজেলার বেড়েরবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুনুর রশিদ (৬০)।

তিনি বলেন, বাঙ্গালী নদীতে বারোমাসই পানি দেখেছি আমরা। এমনিতেই বাঙ্গালী ভাঙ্গণপ্রবন নদী। আর বর্ষার সময় একেবারে বিধ্বংসী রুপ দেখা যেত।

বাঙ্গালী পাড়ের এই বাসিন্দা জানান, তবুও নদীটি কয়েক দশক আগেও স্থানীয়দের জীবন জীবিকার অংশ ছিল। নিয়মিত নৌকা বাইচ হত। ফসল চাষে পানি সেচ হত এ নদী থেকে। বহু জেলে পাড়া গড়ে উঠেছিল। নদীর জৌলুস হারিয়ে যাওয়ায় এখন সব গল্প হয়ে গেছে। 

বাঙ্গালী নদী আবার মানুষের প্রাণ ও জীবিকার উৎস হয়ে উঠুক এমনটা স্বপ্ন দেখেন মামুনুর রশিদ। 

বাঙ্গালী নদী পথ বছর জুড়ে নৌকা চলাচলের উপযোগী করা হবে, সংরক্ষণ করা হবে তীরও। ফাইল ছবি

দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম তিস্তা নদী থেকে বের হওয়া এই বাঙ্গালীর জন্ম ১৭৮৭ সালের দিকে। সোয়া দুইশ বছর বয়সী তরুণ নদীটির যৌবন যেন অকালেই ঝরে গেছে। হারিয়েছে তার স্বাভাবিক গতিপথ। এর দায় কিছুটা প্রাকৃতিক আর কিছুটা মনুষ্যসৃষ্ট।

স্থানীয়দের কাছে জানা যায়, দুই দশক আগেও বাঙ্গালী নদী বগুড়া জেলায় পানিপথে যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে পণ্য পরিবহণসহ ছোটবড় সব ব্যবসার ক্ষেত্রে পূর্ববগুড়ার বাসিন্দারা এ নদী ছাড়া ভিন্ন চিন্তা করতেই পারতেন না।

পরিবর্তনটা খুব দ্রুত ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন ধুনট উপজেলার অংশে বাঙ্গালী নদী পাড়ের গ্রাম বেড়েরবাড়ীর বাসিন্দা আবু সাইদ (৫০)। তিনি বলেন, আমাদের তরুণ বয়স পর্যন্ত বাঙ্গালী নদীতে পাল তোলাসহ অনেক বড় নৌকা চলাচল করতে দেখেছি। পূর্ব বগুড়া থেকে অন্যান্য জেলায় ব্যবসায়ীরা তাদের সব ধরনের পণ্য এই নদী পথে আনা নেওয়া করত।

আবু সাইদ জানান, বাঙ্গালী নদীতে এক সময় বাঘাইড় মাছ প্রচুর পাওয়া যেত। এ ছাড়াও নদীর যেকোন স্থানে পাবদা, রিটা, বোয়াল, আইড়, বাঁশপাতারি মাছ ধরা পড়ত। কিন্তু এখন এসব মাছ আর চোখে পড়ে না।

স্থানীয়রা জানান, দিনের পর দিন নদীতে পলি জমেছে। এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে নদীতে বালু তোলা হয়। এখন শুষ্ক মৌসুমে চর জেগে ওঠে এবং ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। আগের দিনে দেখা যেত নদীর পাড়ে গমের চাষ করা হত। কিন্তু বর্তমানে নদীর নাব্যতা না থাকায় ধান কলাইসহ সবজিরও চাষ করা হচ্ছে।

নদীর পাড়ের অনেক ফসলী জমি এখন মূল নদীগর্ভে। আবার নদীগর্ভের জমি অন্য পাশে ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হয়েছে। নদী ভাঙ্গনের জন্য সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নদী সাথে অবিচ্ছিন্ন মানুষদের। নদীগর্ভে ঘরবাড়ি বিলীন হওয়া মানুষদের এলাকা ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে জীবন যুদ্ধ করে বেচেঁ থাকতে হচ্ছে।

শুকনো মৌসুমে বাঙ্গালী নদী।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র থেকে জানা যায়, বাঙালি নদী বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গাইবান্ধা, বগুড়া এবং সিরাজগঞ্জ জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ১৮৩ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১৪৩ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার।

নদীটি নীলফামারী জেলার কতিপয় ক্ষুদ্র প্রকৃতির খাল থেকে বের হয়ে সৈয়দপুর উপজেলার নিম্নভূমি অতিক্রম করে সাধারণ নদীখাতরূপে রংপুর জেলার পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এখান থেকে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ওপর দিয়ে বিসুর পাড়া ও বিশ্বনাথপুর নামক সোনাতলা উপজেলার অংশে ঢুকে বগুড়ায় প্রবেশ করে বাঙ্গালী নদী। পরে নদীটি সারিয়াকান্দি উপজেলা হয়ে ধুনট, আবার সারিয়াকান্দিতে প্রবাহিত হয়। এভাবে বগুড়ার শেরপুর উপজেলা হয়ে সিরাজগঞ্জে চলে গেছে বাঙ্গালী নদী।

এ নদী থেকে অনেক শাখাও বের হয়েছে বগুড়ার অংশে। বেলাল, মানস, মধুখালি, ইছামতি, ভলকা, সুখদহ এবং অন্যান্য। কিন্তু এই শাখাগুলো শীতের মৌসুমে শুকিয়ে যায়।

বাংলাদেশের নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট ও পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে নদীটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে যমুনা নদীর সঙ্গে নদীটির মিশে যাবার আশঙ্কায়। এর ফলে এলাকার ব্যাপক ভৌগোলিক পরিবর্তন হতে পারে। বাঙ্গালী যদি যমুনা নদীর সাথে মিশে গেলে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের প্রায় এক লাখ হেক্টর এলাকা নদীর পানিতে বিলীন হতে পারে বলে ওই সময় আশঙ্কা করেন প্রকৌশলীরা।

সরকার বাঙ্গালী নদী সংস্কারে পরবর্তীতে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে অতি সম্প্রতি এই মৃতপ্রায় বাঙ্গালীকে জীবিত করতে পুনঃখনন প্রকল্প শুরু হয়েছে। 

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, বাঙ্গালী নদীতে এ প্রকল্পের আওতায় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা থেকে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী এলাকার প্রায় ২১৭ কিলোমিটার নদীপথ খনন করা হবে। এতে সর্বমোট ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ড্রেজিং কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বাকি ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে নদীটির তীর সংরক্ষণ কাজে।

বগুড়ার সারিয়াকান্দি অংশের বাঙালী নদীতে খনন শুরু 

সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ডের বগুড়া বিভাগের সারিয়াকান্দির উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আব্দুল রহমান তাসকিয়া বলেন, মরা নৌ-পথটিকে সচল করতে সিডিউল সময় ধরা হয়েছিলো তিন বছর। আগামী জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার কথা থাকলেও দেশে মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে মাঝ পথে ড্রেজিং কাজ থেমে যায়। যার জন্য আগামী জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। এ জন্য করোনা ভাইরাসের কারণে সময় বাড়ানোর জন্য পান্নি উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চ মহলে আবেদন করা হবে।