বগুড়ায় তীব্র দাবদাহে কদর বেড়েছে তাল শাঁসের
টানা কয়েকদিনের তীব্র দাবদাহে বিপর্যস্ত জনজীবন। সকাল গড়াতেই রাস্তাঘাট যেন আগুন ঝরাতে শুরু করে। প্রচণ্ড রোদ আর ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস করছেন সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে বগুড়াজুড়ে বেড়েছে কচি তালের শাঁসের কদর। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্র রাস্তার মোড়, হাট-বাজার ও জনসমাগমস্থলে মৌসুমি বিক্রেতাদের পসরায় দেখা মিলছে রসালো এই ফলের। গরমে ক্লান্ত পথচারীদের কাছে যেন এক টুকরো স্বস্তির নাম হয়ে উঠেছে তালের শাঁস।দাম কম, স্বাদে মিষ্টি, আবার পুষ্টিগুণেও ভরপুর হওয়ায় শিশু, কিশোর, যুবক থেকে শুরু করে বয়স্কদের কাছেও সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ ফল। তীব্র গরমে শরীর ঠান্ডা রাখা, পানিশূন্যতা দূর করা এবং তাৎক্ষণিক প্রশান্তি দেওয়ার কারণে ক্রেতাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।সরেজমিনে গত সোমবার(৮ জুন) বগুড়া শহরের কাঁঠালতলা, জ্বলেশ্বরীতলা, মফিজ পাগলার মোড়, সেউজগাড়ী, খান্দার, কলোনী, মাটিডালি মোড়, বনানী, চারমাথা ও সাতমাথা এলাকার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার পাশে ছোট ছোট অস্থায়ী দোকান ও ভ্যানগাড়িতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কচি তাল। বিক্রেতারা মুহূর্তেই তাল কেটে শাঁস বের করে দিচ্ছেন ক্রেতাদের হাতে।
কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই খাচ্ছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের জন্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ফলের দাম বেশি হলেও তালের শাঁস সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে। এছাড়া এতে কোনো ধরনের ফরমালিন বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না বলে অনেকেই নিশ্চিন্তে এটি খাচ্ছেন।খান্দার মফিজপাগলার মোড়ে সড়কের পাশে তালের শাঁস বিক্রি করছিলেনসাইদুর রহমান। তিনি জানান, শাজাহানপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে তাল সংগ্রহ করেন। একটি তালগাছ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় কিনে আনেন। প্রতিটি গাছে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০টি তাল পাওয়া যায়। প্রতিদিন প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি শাঁস বিক্রি করেন তিনি। প্রতিটি শাঁস ৫ টাকা এবং পুরো একটি তাল ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হয়। এতে প্রতিটি তালে ৪ থেকে ৫ টাকা লাভ থাকে।মাটিডালি এলাকার বিক্রেতা এখলাস জানান, তিনি আদমদীঘি থেকে তাল সংগ্রহ করেন। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়ে জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ পর্যন্ত চলে এ ব্যবসা। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩০০ থেকে ৫০০টি শাঁস বিক্রি হয়। গরম যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে বিক্রি।কলোনী এলাকার বিক্রেতা ফরিদ বলেন, একটি তালে সাধারণত দুই থেকে তিনটি শাঁস থাকে।
ক্রেতাদের কেউ নরম আবার কেউ একটু শক্ত শাঁস পছন্দ করেন। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ কাঁদি তাল বিক্রি করেন তিনি। গাছ থেকে কাঁদি কেটে এনে বাজারে বিক্রি করতে বেশ পরিশ্রম হলেও ভালো লাভ হওয়ায় এ ব্যবসার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।তালের শাঁস কিনতে আসা ক্রেতা মহসিন আলী বলেন, "প্রচণ্ড গরমে বাইরে থেকে এসে একটি ঠান্ডা তালের শাঁস খেলে শরীর অনেকটা সতেজ হয়ে যায়। পরিবারের সবাই এ ফল পছন্দ করে। তাই প্রায়ই কিনে নিয়ে যাই।"আরেক ক্রেতা রোজিনা বেগম বলেন, "শিশুদের জন্যও এটি খুব উপকারী। দাম কম হওয়ায় সহজেই কিনতে পারি। গরমের সময় বাসায় নিয়ে গেলে সবাই মিলে খেতে পারে।"চিকিৎসকদের মতে, তালের শাঁস শুধু সুস্বাদুই নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর। বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের চিকিৎসক ডা.হালিম জানান, তালের শাঁস শরীর ও পেট ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
এতে রয়েছে প্রচুর জলীয় অংশ, শর্করা, খাদ্য আঁশ, ক্যালসিয়াম ও বিভিন্ন ভিটামিন। প্রতি ১০০ গ্রাম তালের শাঁসে প্রায় ৮৭ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়। এছাড়া এতে থাকা ভিটামিন এ, বি ও সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। খাদ্য আঁশ থাকায় এটি হজমেও উপকারী।তিনি আরও বলেন, তীব্র গরমে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যায়। তালের শাঁসের উচ্চ জলীয় উপাদান দ্রুত সেই ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। পাশাপাশি এটি শরীরকে সতেজ রাখে এবং ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে।কৃষি ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতিবছরই তাপমাত্রা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মৌসুমি ও প্রাকৃতিক ফল খাওয়ার প্রবণতা বাড়ানো প্রয়োজন। তালের শাঁস শুধু একটি সুস্বাদু ফল নয়, বরং গরমের সময় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর একটি প্রাকৃতিক খাদ্য।তাই তীব্র দাবদাহের এই সময়ে বগুড়ার মানুষের কাছে তালের শাঁস এখন কেবল একটি মৌসুমি ফল নয়, বরং স্বস্তি, পুষ্টি ও প্রশান্তির এক অনন্য উৎস হয়ে উঠেছে।
