Joy Jugantor | online newspaper

ব্লু-ইকোনমির টুনা মাছ ধরতে চীন থেকে আসছে দুই জাহাজ

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৫:৫২, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ব্লু-ইকোনমির টুনা মাছ ধরতে চীন থেকে আসছে দুই জাহাজ

ব্লু-ইকোনমির টুনা মাছ ধরতে চীন থেকে আসছে দুই জাহাজ

বিশ্ববাজারে সামুদ্রিক টুনা মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যেখানে এই মাছ রফতানি করে প্রতিবেশি দেশ ভারত, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান বিলিয়ন ডলার আয় করছে। এবার সেই রফতানি খাতে বাংলাদেশ থেকেও যোগ হতে চলেছে ব্লু-ইকোনমির ভান্ডার টুনা মাছ। 

গভীর সমূদ্র থেকে এই টুনা মাছ ধরতে চীন থেকে আনা হচ্ছে দুইটি জাহাজ। যাহার কার্যক্রম আগামী মার্চ থেকে শুরু হতে পারে। এতে দেশের অর্থনীতিতে বাড়বে রফতানি খাতের আয়। 

বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) এমন তথ্য জানান মৎস্য অধিদফতর চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক আবদুস সাত্তার। 

তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরের এক লাখ ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন রয়েছে। তম্মধ্যে মাত্র ২৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা থেকে মৎস্য আহরণ সম্ভব হয়। কারণ ১০০ মিটারের বেশি গভীরতায় মাছ শিকারের সক্ষমতা বাংলাদেশি জাহাজগুলোর নেই। 

ফলে উক্ত ২৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে চারটি পৃথক অঞ্চলে ভাগ করে বাংলাদেশের জাহাজগুলো মাছ শিকার করে। এর বাইরে থেকে যাওয়া বঙ্গোপসাগরের এক্সক্লুইভ ইকোনমিক জোন এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় টুনাসহ পেলাজিক মাছের বিশাল ভান্ডার রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। 

এই ধারণা থেকে টুনা মাছ শিকারের জন্য দেশের ১৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে মাছ শিকারের অনুমোদন দেয়া হয়। যারা নিজেরা জাহাজ কিনে মাছ শিকার করার কথা ছিল। কিন্তু এক একটি জাহাজে বিশাল বিনিয়োগ এবং সুনির্দিষ্ট কোন জরিপ না থাকায় দীর্ঘদিনেও কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টুনা মাছ শিকারের উপযোগী জাহাজ ক্রয় করেনি। এই অবস্থায় বাংলাদেশ মৎস্য অধিদফতর নিজেরাই জাহাজ কিনে টুনা মাছ শিকার এবং জরিপের উদ্যোগ নেয়।

মৎস অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ৬১ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি জাহাজ কেনাসহ আনুষাঙ্গিক কাজের জন্য প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ডলার সংকটসহ নানা প্রতিকূলতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে ৫৫ কোটি ২১ লাখ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। এতে তিনটি জাহাজের স্থলে দুইটি জাহাজ কেনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। 

চীনের ইউনি মেরিন সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড নামের কোম্পানি থেকে জাহাজ দুইটি কেনা হচ্ছে। তাদের ইয়ার্ডে ইতোমধ্যে একটি জাহাজ তৈরি সম্পন্ন হয়েছে। জাহাজটি আগামি মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ওই একটি জাহাজ দিয়েই টুনা মাছ শিকার শুরু করা হবে। দ্বিতীয় জাহাজটির কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। ওই জাহাজটি পৌঁছালে সেটিকেও গভীর সাগরে মাছ শিকারে পাঠানো হবে। গভীর সাগরে টুনা মাছ শিকারের জন্য প্রাথমিকভাবে ৩০ জন ক্রু নিয়োগ দেওয়া ও প্রশিক্ষণ প্রদানের প্রক্রিয়া চলছে।

মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে সাগরের দুইশ মিটার গভীরে টুনাসহ অন্যান্য মাছ শিকারের জন্য জাহাজ দুইটি পাঠানো হবে। বেসরকারি যেসব প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে তাদেরকে উৎসাহিত করতেই মূলত সরকার এই প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে। মৎস্য অধিদফতরের জাহাজ টুনা মাছ শিকারে সফল হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এগিয়ে আসবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মৎস্য আহরণের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা বলেন, টুনা মাছ শিকারের যে উদ্যোগ তাতে এক একটি প্রতিষ্ঠানকে কমপক্ষে ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। কিন্তু কী পরিমান মাছ আছে বা রিটার্ণ কেমন হবে তার কোন সুনির্দিষ্ট জরিপ নেই। তাই এই খাতে বিনিয়োগে কোন প্রতিষ্ঠানই এগিয়ে আসেনি। 

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের সাউথ প্যাচেস, সাউথ অফ সাউথ প্যাচেস, মিডল গ্রাউন্ড এবং সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড এই চারটি অঞ্চলে মাছ শিকার করা হয়। এসব গ্রাউন্ডে মাছ শিকারের জন্য যেতে উপকূল থেকে কমপক্ষে ১০০ নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিতে হয়। টুনা ফিশ শিকার করতে আমাদেরকে কমপক্ষে ৩৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে যেতে হবে। 

এই কর্মকর্তার ভাষ্য, ভারত এবং শ্রীলংকার কাছাকাছিতে থাকা বাংলাদেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাছ শিকার করতে যাওয়ার যে সক্ষমতা তা এখনো আমাদের নেই। তিন থেকে চারদিন জাহাজ চালিয়ে ওখানে পৌঁছাতে হবে। এতে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ প্রয়োজন। রিটার্ণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার আগে এত রিস্ক নিতে কোন বিনিয়োগকারীরই রাজি নন। তিনি সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সরকার যদি সফল হয় তাহলে অবশ্যই আমরাও বিনিয়োগে এগিয়ে আসবো।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, টুনা মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বিশ্বে। বাংলাদেশেও প্রচুর টুনা মাছ আমদানি হয়। তবে তা মাছ আকারে না এসে তা প্রক্রিয়াজাত করে ক্যানে করে আনা হয়। জাপান এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে টুনা মাছের বিশাল বাজার রয়েছে। যা প্রতিবেশি দেশগুলোর মধ্যে ভারত, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া এবং পাকিস্তান গভীর সাগর থেকে প্রচুর টুনা মাছ শিকার ও বিদেশে রফতানি করে বিলিয়ন ডলার আয় করে। 

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান বেলাল হায়দার পারভেজ বলেন, বঙ্গোপসাগরের গভীরে প্রচুর টুনাসহ পেলাজিক জাতীয় মাছের মজুদের সম্ভাবনা রয়েছে। ব্লু-ইকোনমি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের এই উদ্যোগ বড় ধরণের ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

দেশে বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানির ২৬৩টি ফিশিং ভ্যাসেল রয়েছে। এর বাইরে ৭০ হাজারের মতো ট্রলার ও নৌকাও বঙ্গোপসাগরের ২৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকায় মাছ শিকার করে। এসব জাহাজ এবং নৌকা বছরে ৬ লাখ টনেরও বেশি মাছ শিকার করে। বঙ্গোপসাগরের এই অঞ্চলে ৪৭৬ প্রজাতির মাছ ও ৩৯ প্রজাতির চিংড়ি রয়েছে বলে মৎস্য অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে।