দিনাজপুর গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত পাঁচটি উচ্চ ফলনশীল গমের জাত।
প্রতি বছর দেশে গমের চাহিদা ৮০ লাখ থেকে ৮২ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে দেশে উৎপাদিত হয় মাত্র ১০ থেকে ১২ লাখ মেট্রিক টন। প্রতি বছর ২৩ হাজার কোটি থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার ৬৮ থেকে ৭০ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে।
গমের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধি করতে নতুন ৫টি জাত উদ্ভাবন করছে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। যেগুলোর উৎপাদন দ্বিগুণ, পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি, তাপ-লবণাক্ততা ও খরা সহিষ্ণু এবং ব্লাস্টিং, বিভিন্ন রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী ও জিংক সমৃদ্ধ। জাতগুলো সম্প্রসারিত হলে কমবে আমদানি নির্ভরতা, ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে উৎপাদন। ৫ বছরে ৫টি নতুন জাত উদ্ভাবন করা ছাড়াও, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৮টি উচ্চ ফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি মৌসুমের শুরুতে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত নতুন ৫টি নতুন জাতের গমের বীজ প্রদর্শনী ও প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল সারাদেশের ৫ হাজার ৩০০ জন কৃষকের মাঝে। কৃষকের মাঠে আবাদের জন্য অনুমোদন দেওয়া নতুন ৫টি জাতের উৎপাদন হেক্টরপ্রতি সাড়ে ৫ টন থেকে ৬ টন, যা অন্য জাতগুলোর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। সবগুলোই স্বল্প মেয়াদি।
ফলে একই জমিতে ৩ থেকে ৪টি ফসল উৎপাদন করা যায়। পাশাপাশি এসব জাত স্বল্পমেয়াদি, তাপ-লবণাক্ততা ও খরা সহিষ্ণু, ব্লাস্টিং বিভিন্ন রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং জিংক সমৃদ্ধ। এসব জাতগুলোর নামকরণ করা হয়েছে বিডাব্লিউএমআরআই-১, বিডাব্লিউএমআরআই-২, বিডাব্লিউএমআরআই-৩, বিডাব্লিউএমআরআই-৪ এবং বিডাব্লিউএমআরআই-৫। এগুলো তাপ সহিষ্ণু, ব্লাস্ট, পাতার দাগ ও মরিচা প্রতিরোধী, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম, হেলে পড়ে না, লবনাক্তসহ সবত্র আবাদের উপযোগী। জাতগুলো বিশেষভাবে লবণাক্ত এলাকায় চাষাবাদের উপযোগী।
এসব জাত আবাদ করে ভালো ফলন পেয়েছেন কৃষকরা। তারা বলছেন, নতুন জাতের গমগুলোর উৎপাদন খরচ কম, ফলন বেশি। পাশাপাশি রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ একেবারেই কম। ভালো ফলন ও লাভের মুখ দেখে, আগ্রহী হচ্ছেন অন্য কৃষকরাও। এজন্য নতুন জাতগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার দাবি তাদের।
দিনাজপুর সদর উপজেলার রামডুবি এলাকার কৃষক শাহ আনোয়ার হোসেন বলেন, এ সময়ে বোরো আবাদ ছিল না, ভুট্টা হতো না। তখন গম আবাদ করতাম। কিন্তু গমের উৎপাদন অনেক কম ছিল। আগে যেখানে ৫ বিঘা জমিতে গমের আবাদ করতাম, এখন করছি ১০ শতাংশ জমিতে। তবে এখানকার উদ্ভাবিত গমের নতুন নতুন জাতগুলোর বীজ চাষাবাদ করেছি, এগুলোর ফলন অনেক বেশি। স্বল্প সময়ে, স্বল্প ব্যায়ে গম আবাদ করে লাভবান হচ্ছি। এসব গম সব কৃষকের মাঝে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
সদরপুর এলাকার মাইন উদ্দিন বলেন, এখন অনেক উন্নত জাত বের হয়েছে। আগের চেয়ে অনেক ভালো ফলন, রোগ-বালাইও কম। এবারে প্রচুর গম আবাদ হয়েছে, আমরা কৃষকরা লাভবান হচ্ছি। আগে প্রতি বিঘায় (৪৮ শতাংশ জমিতে) ৫ থেকে ৮ মণ হতো। এখন প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ২৮ মণ গম উৎপাদন হতো। নতুন নতুন জাতগুলো আবাদ করতে কৃষকরা আগ্রহী, এসব বীজ পেলে ধারাবাহিকভাবে গমের আবাদ বাড়বে।
নশিপুর এলাকার সিরাজুল ইসলাম বলেন, মানুষের মধ্যে গম দিয়ে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের চাহিদা বেড়েছে। গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রদর্শনীর জন্য আমাদের গমের বীজ দেওয়া হয়েছিল। গম আবাদ করে দেখলাম এবারে যে পরিমাণে ফলন হয়েছে তা অনেক বেশি। নতুন জাতগুলো সব কৃষকরা পেলে সবাই উপকৃত হবেন।
নশিপুর এলাকার সঞ্চয় কুমার বলেন, এক বিঘা জমিতে গম আবাদ করেছিলাম নিজে খাওয়ার জন্য। যে পরিমাণে ফলন হয়েছে নিজের হয়েও বিক্রি করতে পারবো। আগামীতে আরও ২ বিঘা জমিতে গম আবাদ করবো। নতুন জাতগুলোতে সেচ কম লাগে, মাত্র ৩ বার পানি সেচ দিতে হয়েছে। সার ও কীটনাশক কম লাগে। আবার রোগ-বালাই ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ নাই। এই ফলন দেখে আমার এলাকার অন্য কৃষকরাও এই গম আবাদ করতে আগ্রহী হয়েছে।
দশমাইল এলাকার মনসুর আলী বলেন, আমি ডায়াবেটিস রোগী, রুটি খাই। এজন্য নিজেই গম আবাদ করি। গমের এখন অনেক চাহিদা। আগের তুলনায় এখন গমের চাহিদা বেড়েছে। নতুন নতুন জাতগুলোর উৎপাদনও বেশি, আমরা আবাদ করে গম বিক্রি করে লাভবানও হচ্ছি। একেবারেই ঝামেলামুক্ত। কারণ রোগ-বালাই নেই, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ নেই বললেই চলে। ফলে সার ও কীটনাশক স্প্রে তেমন করতে হয় না। এখন গম অনেক উন্নত ফসল। সব কৃষকরা যদি নতুন জাতগুলোর বীজ পায় তাহলে আমরা লাভবান হবো। ভালো ভালো জাতের গম, এসব গমের দরকার আছে।
কাহারোল উপজেলার রামচন্দ্রপুর এলাকার কৃষক শহীদুল ইসলাম বলেন, আগে মানুষ কম গম আবাদ করতো। কারণ অনেক বেশি জমিতে কম ফলন হতো। এখন যে-সব জাত উদ্ভাবিত হয়েছে এগুলোর ফলন অনেক বেশি। কম খরচেই বেশি ফলন পাওয়া যাচ্ছে। এসব গমের বীজ সবাই পেলে গমের আবাদ বাড়বে। আমাদেরকে প্রদর্শনী হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, অনেক ভালো ফলন পেয়েছি। আবার বাজারেও গমের ভালো দাম পাচ্ছি। আমার ফলন দেখে অন্য কৃষকরাও আমার এই বীজ নিতে চাচ্ছেন।
বাংলাদেশ গম ওই ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মাহফুজ বাজ্জাজ বলেন, এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে গত ৫ বছরে উচ্চফলনশীল, রোগ ও ব্লাস্ট প্রতিরোধী ৫টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব জাত স্বল্প দৈর্ঘ্যরে ও স্বল্প সময়ের, ফলে একই জমিতে বছরে ৩-৪ টি ফসল উৎপাদন সম্ভব।
গমের বড়ো সমস্যা ছিল ব্লাস্ট। জাতগুলো ব্লাস্ট প্রতিরোধী, বিশেষ করে বিডাব্লিউএমআরআই-৩ জাতটি খুবই ভালো। ৫টি জাতই জিংক সমৃদ্ধ ও মাত্রা অনেক বেশি। লবণাক্ত অঞ্চলের আবাদের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোতে। পতিত জমিতেও এসব জাত চাষাবাদ করা যায়। এসব জাতগুলো চাষাবাদের সম্প্রসারণ হলে বিদেশ থেকে গমের আমদানি নির্ভরতা কমবে।
তিনি বলেন, গত বছরে দেশে গমের গড় ফলন ছিল হেক্টরপ্রতি ৩.৮৬ মেট্রিক টন। আর নতুন জাতগুলোতে ৫ থেকে ৬ মেট্রিক টন পর্যন্ত উৎপাদন হচ্ছে। এতে করে ২০ শতাংশ গমের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এখন পানির সংকট অনেক বেশি, নতুন জাতের গম চাষাবাদে পানি সেচ কম লাগে। ফলে চর অঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চল ও বরেন্দ্র অঞ্চলে খুব সহজেই গম চাষাবাদ করা যাবে।, রোগ বালাইয়ের দিক বিবেচনা করলে গম উৎকৃষ্ট ফসল। গমে সার কম লাগে, কীটনাশক কম প্রয়োজন হয় এবং পরিবেশবান্ধব।
এসব জাত কৃষকের জমিতে চাষের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এবারে কৃষকরা ভালো ফলন পেয়েছে। এজন্য বীজ উৎপাদন করা এবং সম্প্রসারণ করা দরকার। এটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়। সীমিত পরিসরে জাতগুলোর বীজ উৎপাদন করে বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
এই জাতগুলো কৃষকের মাঠে ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশে গমের উৎপাদনশীলতা বাড়বে। নতুন জাতগুলো সম্প্রসারণ করা হলে কৃষকরা লাভবান হবেন, উৎপাদন বাড়বে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। এতে দেশে গমের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে ও আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা।
প্রতি বছরে গমের চাহিদা বাড়ছে, এতে করে গমের উৎপাদন বাড়ানোর দিকে গুরুত্বারোপ করা উচিত। ৫ বছরে ৫টি নতুন জাত উদ্ভাবন করা ছাড়াও প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৮টি উচ্চ ফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।
