Joy Jugantor | online newspaper

সৌদি আরবে আগুনে নিহত নওগাঁর ৫ জনের গ্রামের বাড়িতে আহাজারি 

নিজস্ব প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৯:০৫, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

সৌদি আরবে আগুনে নিহত নওগাঁর ৫ জনের গ্রামের বাড়িতে আহাজারি 

সৌদি আরবে আগুনে নিহত নওগাঁর ৫ জনের গ্রামের বাড়িতে আহাজারি 

সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে নিহতের প্রায় তিনমাস পর নওগাঁয় বাকি পাঁচজনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে। নিহতদের গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। অগ্নিকান্ডে নিহত ১৬ জনের মধ্যে নওগাঁর বিভিন্ন এলাকার ১২ জন। বাকিদের মধ্যে নাটোর জেলার তিনজন এবং রাজশাহী জেলার একজন।নিহত পাঁচজন হলেন- নওগাঁ শহরের পার-নওগাঁ এলাকার মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গপ্রামের আক্কাস প্রামানিকের ছেলে মিনহাজ প্রামানিক, মাধবপুর গপ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর প্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী।আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের দরিদ্র আক্কাস প্রামানিকের ছেলে মিনহাজ প্রামানিক(২৪)। পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় ৫লাখ টাকা ঋন করে ৭বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি।

সেখানে রিয়াদে সোফা  কারখানায় শ্রমিকের কাজ করতেন। ইচ্ছে ছিলে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হলে দেশে ফিরবেন। বিয়ে করে সংসার করার ইচ্ছে ছিলো। গত ৯ আগস্ট দুপুরে কারখানায় অগ্নীকান্ডে সেই স্বপ্ন নিভে যায়। এরপর সন্ধ্যায় অগ্নীকান্ডে মারা যাওয়ার খবর জানতে পান পরিবারের সদস্যরা। এ খবর পাওয়ার পর থেকে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবারে। বিকেল ৪টায় মিনহাজ প্রামানিকের লাশের কফিন গ্রামের বাড়িতে পৌছায়। ছেলের লাশের কফিন বুকে জড়িয় বার বার বিলাপ করছেন ও মুর্ছা যাচ্ছেন। আগামীকাল রোববার নামাজে জানাযা শেষে কবরস্থ করা হবে। নিহত মিনহাজ প্রামানিকের মা পারুল বিবি বলেন- পরিবারে স্বচ্ছলতার কথা ভেবে সাড়ে ৫ লাখ টাকা ঋন করে ছেলেকে প্রায় ৭ বছর আগে সৌদি পাঠানো হয়েছিল।  এরপর থেকে বৈষিক সমস্যা সহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে ছেলে টাকা পাঠাতে পারেনি।

যা আয় করতে নিজে থাকা খাওয়া করতে শেষ হয়ে যায়। বাড়িতে কোন টাকা পাঠাতে পারতো না। এখন ছেলের এ অবস্থা। ঋন পরিশোধ করা হবে কিভাবে এ নিয়ে দুশ্চিস্তায় আছি। সরকারের কাছে দাবী ছেলের ঋন পরিশোধসহ সহযোগিতা করা হোক।ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় এ বছরের এপ্রিল মাসে সাড়ে ৫লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান নওগাঁ শহরের পার-নওগাঁ এলাকার বাসিন্দা শাহিন। রেখে যান স্ত্রী, ৬ বছরের ছেলে সন্তান, ৮ মাস বয়সী মেয়ে এবং ৬০ ঊর্ধ্ব মাকে। বিদেশে পাড়ি জমানোর পাঁচ মাসের মাথায় শাহিনকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ তার পরিবার এবং স্বজনরা। বারবার কান্না আর শোকে ভেঙে পড়ছেন শাহিনের মা নার্গিস বেগম। আত্মীয় স্বজনসহ প্রতিবেশীরাও অপেক্ষা করছেন শাহিনের মরদেহ এক নজর দেখার জন্য। নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার নিহত শাহিনের মা নার্গিস বেগম বলেন, ছেলে শাহিন কল দিছিলো, বলছিলাম বাবারে আমি কিছু ফল কিনে খাই জানিস তো তুই, আমাকে কিছু টাকা পাঠান। শাহিন বললো মা ১২ তারিখে টাকা পাঠাবোনি, ফল কিনে খাইও। তাতে আমার ছেলেটা আগুনে পুড়ে মরে গেলো। আমার বুকের ধনটা আমাকে রেখে চলে গেলো।

আমি তো একা হয়ে গেলাম, আমি এখন বাঁচবো কী করে। শাহিনের মামি নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, শাহিনের বয়স যখন চার বছর তখন তার বাবা মারা যায়। ছোট থেকেই অনেক কষ্ট করে শাহিন বড় হয়েছে। বিদেশে যেয়ে ভালো টাকা পয়সা হবে এ আশায় বিয়ের পর সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে গেলো ছেলেটা। মারা যাওয়ার তিন দিন আগে প্রথম টাকা পাঠাইতে চাইছিলো। ৩২ হাজার টাকা দিতে চাইছিলো ১২ তারিখে, বলছিলো ২০ হাজার টাকা দিয়ে কিস্তি পরিশোধ করতে এবং বাকি টাকা সংসারের কেনাকাটা করার জন্য। তাতেই ছেলেটা আগুনে পুড়ে মারা গেলো। গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় সংঘটিত অগ্নিকান্ডে ১৬ জন বাংলাদেশী কর্মী মারা যান। এরমধ্যে অগ্নীকান্ডে নিহতেদের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় সনাক্ত হওয়ার পর গত ২৭ আগস্ট নয়জনের মরদেহ বাংলাদেশে আসে। নয়জনের মধ্যে নওগাঁর সাতজন। বাকিদের শরীর আগুনে পুড়ে যাওয়ায় সনাক্ত করতে বিলম্ব হয়।

পরে বাকি সাতজনের মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় সনাক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে নওগাঁর পাঁচজন। মরদেহ বাংলাদেশে প্রেরণের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে শনিবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি ৩৩৬ নম্বর ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরাতে ধার-দেনা করে ৬-৮ বছর আগে নওগাঁর বিভিন্ন গ্রামের ১২ যুবক সৌদিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সৌদি আরবে রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় শ্রমিকের কাজ করছিলেন তারা। গত ৯ আগস্ট দুপুরে হঠাৎ অগ্নিকান্ডে কারখানায় থাকায় ১৬ জন মারা যান। এ ঘটনার পর নিহতের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা চোখে-মুখে অন্ধকার দেখা শুররু করে। নিহতের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষা করছিলেন স্বজনরা।স্থানীয়রা জানান- উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের যুবকরা সৌদিতে কর্মসংস্থানের জন্য পাড়ি দিয়েছিলেন।

যারা নিত্যান্ত দরিদ্র ও অসহায় পরিবারে। অনেকে ঋনগপ্রস্থ। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিতে হারিয়ে দিশেহারা তারা। ঋন পরিশোধে দুশ্চিন্তায় পড়েছে নিহতের পরিবার। ঋন পরিশোধ সহ ঘুরে দাঁড়াতে সরকারি সহযোগিতা দাবী এলাকাবাসীর।আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মনিররুজ্জামান বলেন, পরিচয় সনাক্ত হওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওয়েজ অর্নার্স বোর্ডের সাথে সমন্বয় করে মরদেহগুলো দ্রুত দেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিহতের পরিবারকে ইতোমধ্যে সরকারি ভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে। এছাড়াও আরো সহযোগিতা করা হবে বলে। উল্লেখ্য- সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা কারখানায় অগ্নীকান্ডে ১৬ বাংলাদেশী মারা যান। এর মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ১১ জন এবং নওগাঁ শহরের একজন। বাকিদের মধ্যে নাটোর জেলার তিনজন এবং রাজশাহী জেলার একজন।#