সৌদিতে অগ্নিকান্ডে নিহত ৭ প্রবাসীর এক সাথে জানাযা
সৌদি আরবে রিয়াদে একটি সোফা কারখানায় অগ্নিকান্ডে নিহত সাত প্রবাসীর একসাথে নামাজে নাজাযা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আত্রাই মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল কলেজ মাঠে প্রবাসীর নামাজে জানাযা সম্পূর্ণ হয়েছে। নামাজে জানাযা পড়ান মুফতি রুহুল আমিন। নামাজে জানাযা শেষ লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে কবরস্থানে শায়িত করা হবে। নিহতের গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাসাত ভারি হয়ে উঠে। সন্তান হারিয়ে শোকে বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন স্বজনরা।এসময় নওগাঁ-৬(আত্রাই-রানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল ইসলাম রেজু, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসান মনিরুজ্জামান সহ নিহতের পরিবার, স্থানীয় গ্রামবাসী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ১৬ প্রবাসির মৃত্যু হয়েছে।
নিহতের ১৯ দিন পর ফ্রিঙ্গার প্রিন্টে সনাক্তের পর ৯জনের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। এরমধ্যে সাতজন আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসীন্দা। তাদের মধ্যে চারজন একই গ্রামের। বাঁকী আরো ৬জনের পরিচয় সনাক্ত না হওয়ায় লাশ আসেনি।নিহতরা হলেন- উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দিনের ছেলে ফরিদ, গন্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামানিক, বজলুল রহমানের ছেলে কলিম উদ্দিন, গুফফার আলীর ছেলে মোহন আলী ও সুমন আলী, ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদার এর ছেলে সোহেল রানা, পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে আব্দুল জলিল সরদার।পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরাতে ধার-দেনা করে ৬-৮ বছর আগে নওগাঁর বিভিন্ন গ্রামের ১৬ যুবক সৌদিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেখানে রিয়াদের একটি সোফা কারখানায় শ্রমিকের কাজ করছিলেন তারা। গত ৯ আগস্ট দুপুরে হঠাৎ অগ্নি কান্ডে কারখানায় থাকায় ১৬ জন মারা যান।
এ ঘটনার পর নিহতের পরিবারে যেন শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা চোখে-মুখে অন্ধকার দেখা শুরু করে। নিহতের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষা করছিলেন স্বজনরা।নিহতের ১৯দিন পর ফ্রিঙ্গার প্রিন্ট ১৩ জনের মধ্যে ৭জনের পরিচয় সনাক্ত হয়। বাংলাদেশ দুতাবাস রিয়াদ, সৌদি আরব শ্রমকল্যান উইং এর সহযোগিতায় প্রবাসীদের মরদেহ বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকায় পৌছায়। রাত ১টার পর লাশবাহী প্রিজিং গাড়ীতে করে আত্রাই থানায় রাখা হয়।বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে গন্ডগোলাহী গ্রামের স্কুল মাঠে চারজনের জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় ১০ হাজার মুসল্লি জানাযায় অংশ নেয়। জানাযা শেষে গ্রামের কবরস্থানে পাশাপাশি ৪জনকে দাফন করা হয়। এর আগে এ গ্রামে কখনো জানাযায় এতো মানুষ অংশ নেয়নি।স্থানীয়রা জানান- উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের যুবকরা সৌদিতে কর্মসংস্থানের জন্য পাড়ি দিয়েছিলেন। যারা নিত্যান্ত দরিদ্র ও অসহায় পরিবারে।
অনেকে ঋনগ্রস্থ। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিতে হারিয়ে দিশেহারা তারা। ঋন পরিশোধে দুশ্চিন্তায় পড়েছে নিহতের পরিবার। ঋন পরিশোধ সহ ঘুরে দাঁড়াতে সরকারি সহযোগিতা দাবী এলাকাবাসীর।গন্ডগোহালী গ্রামের নিহত মোহন আলী ও সুমন আলীর বাবা গুফফার আলী বলেন- সংসারের স্বচ্ছলতা ফিরাতে দুই ছেলেকে গত ৭ বছর আগে সৌদি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু অগ্নিকান্ডের ঘটনায় সবকিছু ধুলিসাৎ হয়ে যায়। পরিবারের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। ছেলেরা দেশে ফিরবে বলে ইটের ঘর তৈরি করা হচ্ছে। বিয়ে করে সংসার করবে। কিন্তু তা আর হলো না। এ ঘটনায় আরো দুই জন বেঁচে যায়। তারা কিভাবে এ দূর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে তা সুষ্ঠু তদন্তের দাবী জানায়। একই গ্রামের নিহত রুবেল প্রামানিকের বাবা সাইদুর রহমান বলেন- ৮বছর আগে সাড়ে ৯ লাখ টাকা খরচ করে সৌদি পাঠানো হয়েছিল।
এরমধ্যে ১লাখ টাকা জমানো ও আরো ২ লাখ টাকার জমি বিক্রি করে জোগাড় করা হয়। এরমধ্যে পাসপোর্ট সহ বিভিন্ন কাগজপত্র করতে ১ লাখ টাকা খরচ হয়। সাড়ে ৮লাখ টাকা পরিশোধ করতে প্রায় ৬ বছর লেগে যায়। ৬বছর পর দেশে আসে এবং বিয়ে করে এতে আবার ৬ লাখ টাকা ঋনের মধ্যে পড়তে হয়। বর্তমানে ৫ লাখ টাকা ঋন আছে। এরমধ্যে আগুনে পুড়ে ছেলে মারা যাওয়ায় সবশেষ। এ ঋন কিভাবে পরিশোধ হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়েছে। কারণ ছেলের আয়ে সংসার চলে। সে ছিলো আয়ের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। একমাস বয়সি এক নাতনী জন্ম নিয়েছে। ছেলে নাতনীর মুখটা পর্যন্ত দেখতো পারলোনা। সরকার সহযোগিতা করলে এ ঋন থেকে বাঁচা যাবে। নওগাঁ-৬(আত্রাই-রানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল ইসলাম রেজু বলেন, নিহতের প্রত্যেক পরিবারকে সরকারি ভাবে আর্থিক ভাবে সহযোগিতার করা হবে। সরকার এ ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। এছাড়া বাঁকী মরদেহ দেশে নিয়ে আসার জন্য চেস্টা অব্যহৃত আছে।
