সৌদি আরব-সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বন্দ্ব, মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’
মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দুই দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘদিন ধরেই একই মঞ্চে মিত্র হলেও পর্দার আড়ালে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল স্পষ্ট। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই দ্বন্দ্ব প্রথমবারের মতো সরাসরি সামরিক রূপ নিয়ে প্রকাশ্যে এসেছে। ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দরে সৌদি বিমান হামলার মাধ্যমে এই উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। হামলার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি)-এর জন্য পাঠানো অস্ত্রের একটি চালান, যা আমিরাতের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করে রিয়াদ।আবুধাবি দাবি করে, অস্ত্রগুলো তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য ছিল, এসটিসির জন্য নয়। কিন্তু সৌদি আরব এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি। তাদের মতে, হাদরামাউত অঞ্চলে আমিরাতের প্রভাব বাড়ানো নিরাপত্তার জন্য হুমকি। কারণ ইয়েমেনের এই অঞ্চলটির সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে এবং সেখানে সৌদি-সমর্থিত শক্তির বাইরে অন্য কোনো গোষ্ঠীর আধিপত্য রিয়াদের জন্য কৌশলগতভাবে অগ্রহণযোগ্য।
এই হামলাকে দুই দেশের মধ্যে প্রথম সরাসরি সামরিক মুখোমুখি অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঘটনার পর আমিরাত ইয়েমেন থেকে তাদের অবশিষ্ট সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে মূল দ্বন্দ্বের সমাধান হয়নি। বরং এটি দুই দেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করেছে।বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব তাদের নীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তারা প্রতিষ্ঠিত কাঠামো, বিশেষ করে জাতিসংঘ-কেন্দ্রিক কূটনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। দীর্ঘদিনের সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে সরে এসে রিয়াদ এখন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় বেশি আগ্রহী—যেমন সুদানের সংকটে তাদের অবস্থান।
অন্যদিকে আমিরাতের কৌশল তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। গবেষকদের ভাষায়, আবুধাবি একটি ‘নেটওয়ার্কভিত্তিক প্রভাব বলয়’ তৈরি করেছে, যেখানে রাষ্ট্রের বদলে রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও স্থানীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে প্রভাব বিস্তার করা হয়। লিবিয়া, সুদান, সোমালিয়া ও ইয়েমেনে এমন নেটওয়ার্ক তৈরির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, বন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোয় প্রবেশাধিকার পেয়েছে আমিরাত। যদিও এসব অভিযোগ তারা নিয়মিত অস্বীকার করে।এই নীতিগত পার্থক্য বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতেও স্পষ্ট। সুদানে সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে অবস্থান নিলেও আমিরাতের বিরুদ্ধে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে সমর্থনের অভিযোগ রয়েছে। সোমালিয়ার অংশ সোমালিল্যান্ডকে ইসরায়েলের স্বীকৃতির ঘটনায় অধিকাংশ আরব দেশ আপত্তি জানালেও আমিরাত নীরব ছিল। আবার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে সৌদি আরব তা করতে রাজি নয়। সিরিয়াতেও নতুন সরকারের বিষয়ে দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মতপার্থক্য এখন কূটনৈতিকভাবে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে এবং তা এক ধরনের নীরব ‘শীতল যুদ্ধ’-এ রূপ নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দুই দেশের বিশ্লেষক ও সমর্থকদের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ এর প্রতিফলন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষের সম্ভাবনা কম। কারণ উভয় দেশই আঞ্চলিক শক্তি এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়া কারও জন্যই লাভজনক নয়। ধারণা করা হচ্ছে, তারা নিজ নিজ কৌশলেই এগোবে—সৌদি আরব রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কূটনীতি ও স্থিতিশীলতার পথে, আর আমিরাত নেটওয়ার্কভিত্তিক প্রভাব বিস্তারের পথে।বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত যে পক্ষ প্রভাবকে স্থিতিশীলতা, বৈধতা ও দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতায় রূপ দিতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে। সুদানের পরিস্থিতি বিশেষ করে আমিরাতের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের সমালোচনা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক চাপও তৈরি হচ্ছে।
