Joy Jugantor | online newspaper

বগুড়ার সোনাতলা ইউপি নির্বাচন 

নৌকার মনোনয়ন তালিকায় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের ছেলের নাম

ইমরান হোসাইন লিখন

প্রকাশিত: ১৬:৩১, ১১ অক্টোবর ২০২১

আপডেট: ২১:২৪, ১১ অক্টোবর ২০২১

নৌকার মনোনয়ন তালিকায় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের ছেলের নাম

মানচিত্র।

বগুড়ার সোনাতলা উপজেলায় আসন্ন ইউনিয়ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোয়ন প্রত্যাশী তালিকায় পিস কমিটির চেয়ারম্যানের ছেলের নাম দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীসহ স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ ও সমালোচনা চলছে। 

উপজেলা আওয়ামী লীগ বিষয় স্বীকার করে বলছে, আগের ওই তালিকা সংশোধন করার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। 

মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় থাকা ওই ব্যক্তির নাম আনারুল ইসলাম টিপু। তিনি জোড়গাছা ইউনিয়নের তৎকালীন পিস কমিটির চেয়ারম্যান মৃত খবিবরের ছেলে। এ ছাড়া টিপু জোড়গাছা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে জোড়াগাছা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য।

এবারের জোড়গাছা ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন প্রত্যাশী আনারুল ইসলাম টিপু। উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দলের কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডে নাম অন্তুভূক্তির জন্য গত ১০ সেপ্টেম্বর আবেদন ফরম বিতরন করেন সোনাতলা উপজেলা আওয়ামী লীগ। এতে ৭টি ইউনিয়নের ৫৪ জন প্রার্থী ফরম উত্তলন করেন এবং জমা দেয় ৫২ জন। গত ২৩ সেপ্টেম্বর এ তালিকা জেলা আওয়ামী লীগ কেন্দ্রে পাঠায়। ফরম উত্তোলনকারীদের মধ্যে যোগ্য, অযোগ্য, হাইব্রিড, নব্য আওয়ামী লীগসহ নানা শ্রেনী পেশার প্রার্থী ছিলেন।

উপজেলায় অভিযোগ রয়েছে, টিপুর বাবা খবিবর মুক্তিযুদ্ধের সময় পিস কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। আবার স্থানীয় অনেকে তাকে রাজাকার হিসেবেই চেনে। 

টিপুর বাবা খবিবর পিস কমিটিতে সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানা যায় বগুড়ার শহরের সূত্রাপর বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক কাইয়ুম সওদাগরের কাছে থেকে। তিনি বলেন, খবিবর রহমান পিচ কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন সে খান সেনাদের সহযোগী ছিলেন সে-সময় গ্রামের অসহায় নারী ও পুরুষদের উপর অত্যাচার নিপীড়ন করার কারনেই তাকে হত্যা করা হয়েছিলো। কথা প্রসঙ্গে তিনি যুদ্ধের সময়কার নানা ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দেন। 

কাইয়ুম সওদাগর ‘বগুড়ার মুক্তিযুদ্ধ’ নামক বইটিতে তার মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন। সেখানে খবিবরের ইতিহাস উল্লেখ করা আছে। 

বইয়ের কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করা হলো- ‘নারুয়ামালা হাটের পাশে গ্রামের একজন মসজিদের ইমামের মাধ্যমে শুনতে পাই তিনি বলেন, আমাদের গ্রামের রাজাকারেরা প্রায়ই আমাদের গ্রাম হতে মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে খান সেনাদের হাতে তুলে দেয়। রাজাকাররা  বলছে, তোর মেয়েকে খান সেনাদের কাছে দিতে হবে, নইলে তোরা জানে বাঁচতে পারবি না। শুধু তাই নয়, তোর বাড়ি ঘর আগুন লেগে পুড়িয়ে দেয়া হবে। ভাই আপনারা আমাকে বাঁচান। আমি মাহবুবুর রহমান, গ্রুপ কমান্ডার আব্দুস সবুর ইসলামকে বলিলাম আপনাকে যেভাবে বলি সেভাবে কাজ করবেন। খান সেনাদের দাওয়াত করেন যেনো আপনাকে সন্দেহ করতে না পারে। সে মোতাবেক দাওয়াত দেয়া হলো, দুজন খান সেনা ও দুজন রাজাকার আসলো। এসেই বললো তোর মেয়েকে বের কর। ইমাম সাহেব বললো আপনাদেরকেতো বলছি মেয়েকে আপনাদের হাতে তুলে দিবো আপনারা আগে খেতে বসুন। তারা গালি দিতে দিতে খেতে বসলো, বন্দুকগুলো ঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখলো। এই সুযোগে পাশেই জঙ্গল থেকে এসে তাদের ধরে হাত-পা বেঁধে ফেলি আমরা।

সোনাতলার গনসার পাড়া গ্রামের তহসিনের বাড়িতে শেল্টার করি। গ্রামের লোকজন এসে আমাদেরকে বলে খবিবর রহমান পিচ কমিটির চেয়ারম্যান (গ্রামের নাম পূর্ব করমজা) সে খানসেনাদের ও রাজাকারদের সঙ্গে এসে গ্রামের ভিতর অন্যয় অত্যাচার করে। এবং জোর পূর্বক গ্রাম বাসীদের ঘর থেকে গরু, ছাগল নিয়ে খানসেনাদের রসদ জোগায়। এমন কথা অনেকের মুখে শোনার পর, গ্রুপ কমান্ডার সবুর ও আমি ফিল্ড কমান্ডার মাহবুবুর রহমান তাকে ধরার জন্য খোঁজ-খবর নিয়ে দেখি সে হাটের মধ্যে তার ভাই সহিম ডাক্তারের ঘরে বসে আছে। অপেক্ষা করার পর রাত সারে আটটার দিকে বাড়ি ফেরার জন্য হাটের বাহিরে আসলে তাকে আমরা অপারেশন করি (হত্যা করি)।’

স্থানীয়দের অনেকে বলেন, খবিবর পিচ কমিটির চেয়ারম্যান আবার কেউ বলছেন রাজাকার, যার কারনেই তাকে হত্যা করা হয়েছিলো। নানা অত্যাচার, নিপীড়ন ও জুুলুম করার  কারনেই অতিষ্ট হয় এলাকার নারী ও পুরুষরা। তাদের অভিশাপের ফলেই নাকি তার এমন করুন মৃত্যু হয়েছিলো।

দলের নেতা-কর্মী ও স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক না পাওয়ায় নৌকার পক্ষে কাজ না করার অভিযোগ রয়েছে আনারুল ইসলাম টিপুর বিরুদ্ধে। বরং বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে করেছেন তিনি। টিপুর নিজের ভাই সুলতান হাবীব স্বপন জোরগাছা ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য, আওয়ামী লীগ পার্টি অফিস ভাংচুরসহ বিভিন্ন জায়গার নাশকতা মামলার আসামী ও স্বাক্ষী সে।

টিপুর ভগ্নীপতি আমিনুল ইসলাম মাস্টার গাবতলী উপজেলা বিএনপির দীর্ঘ দিনের সভাপতি। এমন নানা ঘটনার কারনেই টিপুকে নিয়ে চলছে বেশ আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই বলছেন দীর্ঘদিন থেকে দলের সাথে জড়িত থাকলেও তার আতাত রয়েছে বিএনপির নেতা কর্মীদের সাথে।

টিপুর ভাতিজা হামিদুল ইসলাম লিটু থানা বিএনপির সদস্য এবং সাবেক জোরগাছা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। বিগত উপ-নির্বাচনে হাট করমজা আওয়ামী লীগ পার্টি অফিস ভাংচুর করে এবং নিজেই বাদি হয়ে আওয়ামী নেতা-কর্মীদের নামে মামলা দেন। বর্তমানে মামলাটি পিবিআইতে তদন্তাধীন। 

এসব অভিযোগের বিষয়ে আনারুল ইসলাম টিপু বলেন, আমি দলের ত্যাগী কর্মী এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য। তবে তিনি ফোনে অন্য অভিযোগের বিষয় এড়িয়ে যান।

জানতে চাইলে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিনহাদুজ্জামান লীটন বলেন, গত মাসে তালিকা পাঠানোর পরে আমরা জানতে পারি টিপুর বাবার পিস কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। এ জন্য আমরা ওই তালিকায় টিপুর নাম বাতিল করে নতুন তালিকা পাঠাবো।