Joy Jugantor | online newspaper

‘মানবিক’ পুলিশ কনস্টেবল শওকত চাকরিচ্যুত

ডেস্ক রির্পোট

প্রকাশিত: ২২:৩৯, ২৭ এপ্রিল ২০২৩

‘মানবিক’ পুলিশ কনস্টেবল শওকত চাকরিচ্যুত

ফাইল ছবি ।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কনস্টেবল শওকত হোসেনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। গত ১৬ এপ্রিল তার চাকরিচ্যুতির আদেশে স্বাক্ষর করেন সিএমপির বন্দর বিভাগের উপকমিশনার শাকিলা সোলতানা। আদেশের কপি সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায়ের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

আদেশে বলা হয়েছে, ‘৭১ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া অভিযুক্ত (শওকত হোসেন) শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যা থাকায় এবং বেওয়ারিশ মানুষ নিয়া মানবিক কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকায় পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি করা তার পক্ষে সম্ভব নয় এমন বক্তব্য লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।’

শওকত হোসেনের এমন বক্তব্যের পর গত ১৬ এপ্রিল সিএমপির উপকমিশনার (বন্দর) শাকিলা সোলতানা চাকরিচ্যুতির আদেশে স্বাক্ষর করেন। আদেশে লেখা হয়, ‘অভিযুক্তের কৃত অপরাধের শাস্তিস্বরূপ গুরুদণ্ড হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ পদের চাকরি হইতে ডিসমিসের (বরখাস্ত) আদেশ প্রদান করা হইল।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাকিলা সোলতানা গণমাধ্যমকে বলেন, শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হয়েছিল। সেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে শওকত বক্তব্য দিয়েছেন। এর আলোকে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

একই বিষয়ে সিএমপির উপকমিশনার (সদর) মোহাম্মদ আবদুল ওয়ারীশ জানান, কনস্টেবল শওকত হোসেনের চাকরিচ্যুত আদেশ হয়েছে। এখন তিনি (শওকত) চাইলে সিএমপি কমিশনারের কাছে আপিল করতে পারেন। এরপরও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এদিকে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর কারও সঙ্গেই কথা বলছেন না শওকত হোসেন। বুধবার (২৬ এপ্রিল) একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে ফোন দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ফোন ধরে হৃদয় নামের একজন বলেন, ‘শওকত ব্যস্ত আছেন, পরে কথা বলবেন। পরে ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি। শওকত হোসেনের নীরবতার বিষয়ে তার সহকর্মীরাও মুখ খুলছেন না।

২০১৯ সালে তৎকালীন সিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমানের আদেশে মানবিক পুলিশ ইউনিটের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তখন কমিশনার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ৫০ হাজার টাকাও দিয়েছিলেন। শওকত হোসেনের চাকরিচ্যুত আদেশের মধ্যদিয়ে মূলত সিএমপির মানবিক পুলিশ ইউনিট বন্ধ হয়ে গেল।  

বেওয়ারিশ মানুষদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে ইতিবাচক কার্যক্রমের মাধ্যমে পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করায় তখন গণমাধ্যমে পুলিশের এই উদ্যোগ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।

সিএমপির এমন উদ্যোগের পর কিছু পুলিশ সদস্য মানবিক কার্যক্রম বাড়িয়ে দেন। অনেকেই নিজদের নামের আগে ‘মানবিক’ শব্দটি ব্যবহার শুরু করেন। এখন যে মানবিক পুলিশিংয়ের প্রচারণা চালানো হয়, সেটার ভিত্তি পেয়েছিল সিএমপির উদ্যোগের কারণে।

শওকত ২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ডবলমুরিং থানা এলাকায় একটি মাহফিলে অতিথি হয়ে যান এবং ‘বিতর্কিত’ বক্তব্য দেন। সেই বক্তব্যের জেরে পরবর্তী সময়ে তাকে দামপাড়া বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতাল থেকে বদলি করে কর্ণফুলী থানায় পাঠানো হয়।

এছাড়াও শওকতের অনেক কর্মকাণ্ডও প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। তিনি পুলিশের চাকরি করলেও কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকতেন। সে সময় তিনি রোগীদের নিয়ে ভিডিও করতেন। 

চকবাজার এলাকার আমিনুল ইসলাম শওকতের মানবিক কাজকে শুধুই মানবিক কাজ হিসেবে দেখতে রাজি নন। তিনি মনে করেন যে কোনো কাজের ক্ষেত্রে শওকত ভিডিওতে আগ্রহী। এই ভিডিও অর্থ উপার্জনে সহায়ক। বললেন, ফেসবুক ও ইউটিউবে মনিটাইজেশন না থাকলে হয়তো ইদানীং এতো মানবিকতা চোখে পড়তো না।

নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার বাসিন্দা শওকত হোসেন ২০০৫ সালে পুলিশ কনস্টেবল পদে যোগ দেন। ২০০৯ সালে ঢাকা থেকে বদলি হয়ে রাঙামাটিতে যান। সেখান থেকে আসেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে। চাকরির পাশাপাশি তিনি তিন বছরের ডিপ্লোমা এবং দুই বছরের প্যারামেডিকেল কোর্স সম্পন্ন করেন। ২০১১ সাল থেকে তিনি চট্টগ্রাম মহানগরীর অসহায়, দুস্থ ও বেওয়ারিশ মানুষদের নিভৃতে চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু করেন। হাসপাতালের নিয়মিত দায়িত্ব পালনের পর তিনি মহানগরীতে ঘুরে ঘুরে স্বজনহারা, নাম-পরিচয়হীন অসুস্থ মানুষদের সেবা দিতেন, ওষুধপথ্য জোগাড় করে দিতেন। ধীরে ধীরে তার সঙ্গে একাধিক কনস্টেবল স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন।

দীর্ঘদিন নিভৃতে কাজ করে যাওয়া শওকত হোসেন ২০১৯ সালের ২৯ নভেম্বর পুলিশের কল্যাণ সভায় রাস্তায় পড়ে থাকা অসহায় মানুষদের সেবা দেওয়ার বিষয়টি তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমানের সামনে উপস্থাপন করেন। তখন শওকত হোসেনের মানবিকতার বক্তব্য শুনে কমিশনার ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ‘মানবিক পুলিশ ইউনিট’ গঠন করেন। বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে সিএমপিই সর্বপ্রথম এমন উদ্যোগ চালু করে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।