Joy Jugantor | online newspaper

করোনায় ভাগ্য বদল বগুড়ার আকবরের

আসাফ-উদ-দৌলা নিওন

প্রকাশিত: ১৮:০৭, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

আপডেট: ২১:৪২, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

করোনায় ভাগ্য বদল বগুড়ার আকবরের

বগুড়ার শহরের শহীদ খোকন পার্ক।

বেলা একটা। বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রের শহীদ খোকন পার্ক। দুপুরের এ সময়টায় ব্যস্ততার ফাঁকে অনেকেই আসেন পার্কে। একটু বসে জিরিয়ে নিতে।  এমন সময়ে আরও একজন ঢুঁ মেরে যান পার্কে। তবে তার আসাটা ব্যবসার উদ্দেশ্যে।  

৩৩ বছর বয়সের এই যুবকের নাম আলী আকবর হোসেন। তার পেশা মানুষের ডায়াবেটিস, প্রেশার মাপা। এ ছাড়াও এখন অক্সিজেন মাত্রা, ওজন পরিমাপও করেন। এই কাজ করে দৈনিক অন্তত ৫০০ টাকা রোজগার করে তিনি। 

খোকন পার্কে প্রেশার মাপতে দেখে আলী আকবরের সাথে আলাপ হয়। তিনি বলেন, নিজের ডায়াবেটিস রয়েছে। ডায়াবেটিসের মাত্রা পরিমাপের জন্য শখ করে মেশিন কিনেছিলাম। এখন এটাই আমার আয়ের উৎস। 

আলী আকবরের বাড়ি সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার উত্তর দেলুয়া গ্রামে। তবে ১৯৯৮ সাল থেকে বগুড়ায় রয়েছেন। এখানে শহরের জেলা পরিষদের গলিতে মেসে থাকেন।

নিউমার্কেটে কাপড়ের দোকানে চাকরি করতেন। গত বছরের মে মাসের শেষে করোনা প্রকোপের কারনে চাকরি হারাতে হয়। তারপর থেকে ভ্রাম্যমাণ এই সেবামূলক পেশা পুরোদমে চালু করেন।

 

আকবরের সাথে কথা বলে জানা যায়, শহরে ঘুরে ঘুরে প্রেশার, ডায়াবেটিস পরিমাপের কাজ আরও আগে থেকে শুরু করেছিলেন। তার ডায়াবেটিস ধরা পড়ে ২০১৫ সালে। তখন নিজের ডায়াবেটিস পরিমাপ করার জন্য একটি যন্ত্র কিনেন। বিভিন্ন দোকানে এসব পরীক্ষা করে ফি নেয়া দেখে বাড়তি আয়ের উপায় করেন। 

২০১৭ সালের দিকে এসে সকাল করে বের হতেন প্রেশার, ডায়াবেটিস পরীক্ষার জন্য। এর আগে অবশ্য পরিচিত ফার্মেসি, চিকিৎসকদের কাছে থেকে পরীক্ষা করা শিখে নিয়েছিলেন।  

ওই সময়ে প্রতিদিন ভোরে ফজরের নামায পড়ে মসজিদের সামনে বসতেন। সাতমাথার আশেপাশে লোকদের এসব পরীক্ষা করে দিতেন। এভাবে সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত কাজ করে বাসায় গিয়ে খাওয়া দাওয়া করতেন। তারপর যেতেন নিউ মার্কেটের কাপড়ের দোকানে। 

তবে এই নিয়মের পরিবর্তন ঘটে গত বছর। করোনা মহামারিতে সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। অন্য সব মানুষের মত আলী আকবরকেও বিপাকে পড়তে হয়। দোকান বন্ধ হওয়ায় তিনি চলে যান দেশের বাড়ি বেলকুচিতে। 

প্রথম দিকে দোকানের মালিক কিছু টাকা দিয়েছেন বিকাশে। কিছুদিন পরে সে টাকা দেয়াও বন্ধ হয়ে যায়। তখন বন্ধ হয়ে যায় সব আয়। এভাবে দু মাস কেটে যায়। এ অবস্থায় সংসারকে টিকে রাখার জন্য আলী আকবর আবার চলে আসেন বগুড়ায়। 

আকবর বলেন, বাড়িতে ছোট সন্তান। তার দুধের যোগাড় করতে হয়। আয় রোজগার বন্ধের কারনে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। পরে উপায় না পেয়ে বগুড়া চলে আসি।  

কিন্তু এসে বিপাকে পড়তে হয় তাকে। আগস্ট মাসের দিকে জজ কোর্টের সামনে সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হন। তখন আবার বেশ কিছুদিন বিছানায় থাকতে হয় আলী আকবরকে।

এরপর সুস্থ হয়েই ডায়াবেটিক, প্রেশার মাপার যন্ত্র নিয়ে বের হই বললেন আকবর। তিনি বলেন, প্রথম দিকে সারাদিন ঘুরে দুই থেকে তিন জন মানুষ পেতাম পরীক্ষা করার। কিছু দিন পর থেকে মানুষজনের কাছে অনেকটা পরিচিত হয়ে উঠি। এখন দিনে ১৫ থেকে ২০ জন করে মানুষের পরীক্ষা করতে পারি। এ থেকে দিনে অন্তত ৫০০ টাকা আয় হয়।

আকবর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। অনেকে তাকে ওষুধ বিক্রির পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি এটা জানেন ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়া ওষুধ বিক্রি বা প্রেসক্রিপশন করা ঠিক নয়। 

আলাপের এক ফাঁকে তিনি জানান, ডায়াবেটিস পরীক্ষার জন্য ৩০ টাকা নেন। প্রেশার ও অক্সিজেন মাপতে ১০ এবং ওজন মাপতে ৫ টাকা করে নিয়ে থাকেন।  সপ্তাহের কয়েকদিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এলাকায় ঘুরেন। বাকি কয়েকদিন নিউমার্কেট, খোকন পার্ক এলাকায় ঘুরেন। মঙ্গলবার করে কামারগাড়ী আজিজুল হক কলেজ এলাকায় যান।

আলী আকবর বলেন, এখন ভালো লাগে। একটা স্বাধীন পেশা রয়েছে। বাড়িতে নিয়মিত টাকা পাঠাচ্ছি। দুই মেয়ে বড় হচ্ছে। তাদের জন্য অনেক খরচ লাগে।  এখন ঋণের টাকাটা পরিশোধ হলে আরও নিশ্চিন্ত হব।