Joy Jugantor | online newspaper

পৃথিবীতে নতুন মহাসাগরের সন্ধান দিচ্ছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

প্রকাশিত: ১৭:০৯, ২৫ জুন ২০২১

পৃথিবীতে নতুন মহাসাগরের সন্ধান দিচ্ছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

ফাইল ছবি

বিশ্বজুড়ে লাখো শিশু ছোটবেলা থেকে ভূগোল সম্পর্কে যেসব মৌলিক বিষয় মুখস্থ করে আসছে, তার মধ্যে একটি হলো, পৃথিবীতে সাতটি মহাদেশ এবং চারটি মহাসাগর আছে। 

কিন্তু এবার ভূগোলের পাতা বদলে যাবে বলে মনে হচ্ছে। কারণ বিশ্বের খ্যাতনামা ও সুপরিচিত ম্যাপমেকিং গ্রুপ, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে যে পৃথিবীতে পঞ্চম আরেকটি মহাসাগরের অস্তিত্ব রয়েছে; যার নাম সাউদার্ন ওশান বা দক্ষিণ মহাসাগর। অ্যান্টার্কটিকার চারপাশ ঘিরে রয়েছে এই মহাসাগরের পানি।

প্রশান্ত মহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের সবচেয়ে দক্ষিণাংশের এই সঙ্গমস্থল সবসময়ই কৌতূহলোদ্দীপক বা কখনো কখনো বিতর্কিত এক জায়গা হয়ে ছিল সমুদ্রবিজ্ঞানীদের কাছে।

নতুন মহাসাগরের অস্তিত্ব ঘোষণা দেয়ার বিষয়টি কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের 'প্লানেট পসিবল' ঘোষণার সাথে মিলে গেছে। 'প্লানেট পসিবল' ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এমন একটি উদ্যোগ যেখানে বিশ্ববাসীকে এই গ্রহে আরো নমনীয়ভাবে বসবাস করতে অনুপ্রাণিত করা হবে ও তথ্য দেয়া হবে।

নামে কী আছে

সাধারণত রাজনৈতিক কোনো পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের মানচিত্রে পরিবর্তন আসে। উদাহররণস্বরূপ বলা যায়, চেকোস্লোভাকিয়া ভেঙে চেক রিপাবলিক এবং স্লোভাকিয়াতে পরিণত হওয়া; কিংবা সোয়াজিল্যান্ড এর নাম বদলে ভোটদানের মাধ্যমে এর নাম ইসোয়াতিনি রাখা।

কিন্তু এমন কোন পরিবর্তনের প্রতিফলন ছাড়াই পৃথিবীর মানচিত্র পরিবর্তন করতে নতুন আরেকটি মহাসাগর আবিষ্কার করা কোনো ম্যাপমেকারের পক্ষে খুবই বিরল ঘটনা। 

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ভূগোলবিদ অ্যালেক্স টেইট ব্যাখ্যা করেছেন কেন নামকরণ কনভেনশন এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি সিএনএন ট্রাভেলকে বলেন, 'পৃথিবীকে চিত্রাঙ্কিত করার একটা অংশ হচ্ছে, স্থানের নাম ও বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করা যা জনসাধারণের মধ্যে পরিচিত। আর এখানে ভূরাজনৈতিক নামকরণ ছাড়াও অন্যান্য বিষয় আছে। মহাসাগর হচ্ছে ঐ সব বিষয়ের একটি, তাই বিজ্ঞানী, পর্যটক, লেখক ও সাধারণ মানুষ কিভাবে স্থানের নাম ব্যবহার করছে; তার একটা হিসাব আমরা রাখতে চাই।'

তবে টেইট এও জানাতে ভুললেন না যে, যদিও পৃথিবীর মানচিত্রকরণে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের বিশেষ খ্যাতি থাকায় নব্য মহাসাগরের নাম নিয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক ডিক্রিটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে; কিন্তু অনেকে এরই মধ্যে দক্ষিণ মহাসাগর নামটি ব্যবহার করা শুরু করে দিয়েছে।  

কিভাবে চেনা যায় মহাসাগর

টেইট জানান, যখনই মহাসাগর নিয়ে আপনাকে জানতে-বুঝতে হবে, তখন মৌলিক বিষয়গুলো দিয়ে শুরু করতে হবে। 'পৃথিবীতে একটাই মহাসাগর আছে এবং বাকিগুলো এর সাথে আন্তঃসম্পর্কিত', বলেন টেইট।

তিনি আরো বলেন, 'আমরা মহাসাগরের আঞ্চলিক অবস্থান নিয়ে কথা বলছি, আর প্রথাগতভাবে এটাই জানি যে চারটা মহাসাগর রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানী ও অন্যান্য অনেকেই বহু বহু বছর ধরে অ্যান্টার্কটিকার আশেপাশের অঞ্চলকে দক্ষিণ মহাসাগরই বলে আসছেন।'

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে দক্ষিণ মহাসাগর ভিন্ন কিছু হয় কি করে?

এর জবাবও দিয়েছেন টেইট।

আটলান্টিক, প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের উষ্ণ পানি থেকে অ্যান্টার্কটিকার দিকে যেতে যেতে আপনি অত্যন্ত শীতল পানি পাবেন। সেখানে স্বতন্ত্র এক প্রাণিকুল দেখতে পাবেন আপনি। পরিবেশগত নানা কারণে দক্ষিণ মহাসাগর অঞ্চলে মিংক তিমি, নির্দিষ্ট এক প্রজাতির সীল মাছ, পেঙ্গুইন, মাছ ও পাখি ইত্যাদি প্রাণী প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পৃথিবীর পঞ্চম মহাসাগরের নামটি দিয়েছে ৮ জুন, বিশ্ব মহাসাগর দিবসে। তাদের এই ঘোষণার পেছনের উদ্দেশ্য ছিল, নাম প্রদানের ফলে এই জায়গাটির একটি নির্দিষ্ট মর্যাদা প্রতিষ্ঠা হবে।

সমুদ্র সংরক্ষণ করা একটি বিশাল প্রকল্প এবং এ সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা খুব সহজ কাজ নয় যা দক্ষিণ মহাসাগরের ক্ষেত্রেও সত্য।

জলসীমা চিত্রায়িত করতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সাধারণত ৬০ ডিগ্রী দক্ষিণ অক্ষাংশ ব্যবহার করে। তবে অস্ট্রেলিয়া তাদের দেশের দক্ষিণাংশের সবকিছুকেই দক্ষিণ মহাসাগর হিসেবে বিবেচনা করে।

এরই মধ্যে অনেক দেশ ও সংগঠন দক্ষিণ মহাসাগরকে চিনলেও, এর অবস্থান নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বিমত আছে।

এছাড়াও, এটির সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।

নতুন মহাসাগর কি ভ্রমণোপযোগী 

ফরাসি অনুসন্ধানকারী ও পরিবেশবাদী জ্য-লুই এতিন সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি দক্ষিণ মহাসাগর সম্পর্কিত গবেষণার জন্য বিশেষভাবে একটি ভাসমান ল্যাব আবিষ্কার করেছেন। 

তার এই আবিষ্কারের নাম দেয়া হয়েছে 'পোলার পড'; এটির কোনো মোটর নেই এবং এটি অ্যান্টার্কটিকাকে প্রদক্ষিণ করতে ধীরে ধীরে পানিতে ভাসতে ভাসতে চলবে এবং ডেটা সংগ্রহ করবে। 

২০২৪ সালের মধ্যে এতিন তার এই ভাসমান যান এর কাজ সম্পন্ন করবেন এবং তা চালু করবেন।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় সাউদার্ন ওশান কার্বন অ্যান্ড ক্লাইমেট অবজার্ভেশনস অ্যান্ড মডেলিং প্রজেক্ট চালু করেছে। তারা মহাসাগরে ২০০ রোবটিক ফ্লোট পাঠাবে যার মধ্যে থাকা সেন্সরের মাধ্যমে লবণাক্ততা, অক্সিজেনের মাত্রা, ক্লোরোফিল ও অন্যান্য পরিবেশগত ডেটা নেয়া হবে।

তবে ভ্রমণপিপাসু দুঃসাহসিকদের জন্য দক্ষিণ মহাসাগরে যাওয়ার কাজটা খুব সহজ হবে না বলেই জানিয়েছেন তারা। এই মহাসাগরে যাওয়া কঠিন, তবে অসম্ভব নয়।

এখানে আসার জন্য আপনাকে আগে অ্যান্টার্কটিকাগামী জাহাজে উঠতে হবে এবং অবশ্যই বমি নিবারণের ওষুধ নিতে হবে, কারণ এখানকার পানি ভয়াবহ রকমের ঢেউ খেলানো। 

সূত্র- সিএনএন