Joy Jugantor | online newspaper

ফসলি জমিতে ছাড়পত্রবিহীন ইটভাটা, অবাধে চলছে শিশুশ্রম

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৩:১৬, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আপডেট: ২২:৩৪, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ফসলি জমিতে ছাড়পত্রবিহীন ইটভাটা, অবাধে চলছে শিশুশ্রম

ছবি সংগৃহীত

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইটভাটা। এসব ইটভাটায়  অবাধে চলছে শিশুশ্রম। নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই কোনো লাইসেন্স। একদিকে ক্ষতি হচ্ছে ফসলি জমির উর্বর মাটি। অপরদিকে বিপর্যয়ের আশঙ্কা পরিবেশের।

জানা গেছে, উপজেলায় ইটভাটা আছে ১০টি। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমিতে মেসার্স  ফ্রেন্ডস ট্রেডার্স, খোকন ট্রেডার্স ১ ও ২ পিএসকে এলটিবিসহ আরো কয়েকটি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় স্থাপিত কোনো ইটভাটার হালনাগাদ ছাড়পত্র নেই। আইন ও বিধি লঙ্ঘন করেই চলছে এসব ইটভাটা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২০১৩ সালের ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্র আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাহাড়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং লোকালয় থেকে এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে কোনো ইটভাটা নির্মাণ করা যাবে না। আবাসিক, বাণিজ্যিক, সরকারি মালিকানাধীন ও কৃষিজমিতে ইটভাটা নির্মাণ করার নিয়ম নেই। এছাড়াও স্থানীয় সরকার নির্মিত রাস্তা থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার, রেলপথ ও হাসপাতাল থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরে ইটভাটা তৈরি করতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনা করেই পরিবেশ অধিদপ্তর ইটভাটার ছাড়পত্র দেয়। 

অভিযোগ আছে, কৃষিজমি, ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় সব ইটভাটাতেই ১৮ বছরের কমবয়সী শিশুরা ইট তৈরি ও পোড়ানোর কাজ করছে। স্কুল ও মাদরাসাগুলো বন্ধ থাকায় স্কুলপড়ুয়া কমবয়সী শিশুরা টাকার প্রয়োজনে শিশুশ্রমে ঝুঁকে পড়ছে। কম টাকায় শিশুশ্রমিক পাওয়ায় এতে ভাটার মালিকরাও সুযোগ নিচ্ছেন। গত ১০ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে গেলে এর সত্যতাও পাওয়া যায়। মেসার্স ফ্রেন্ডস ট্রেডার্সে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার পাটেশ্বরী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্র আবু বক্বর সিদ্দিক, ৭ম শ্রেণির ছাত্র আশরাফ, ভূরুঙ্গামারী সিনিয়র মাদরাসার ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আরমান ও ২ নং পাইকেরছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র মোবারকসহ আরো অনেকেই কাজ করছে।

শিশুরা জানায়, তারা এক লাইন ইট উল্টালেই ত্রিশ টাকা মজুরি পাই। আর ইট তৈরির কাজ করলে আরো বেশি টাকা পাই। স্কুল বন্ধ, তাই আমরা প্রায় প্রতিদিনই এই কাজ করছি।
 
এছাড়াও দেখা গেছে, ভাটার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কোনো স্বাস্থ্য সুরক্ষাও নেই বললেই চলে।  শ্রমিকদের মুখে নেই কোনো মাস্ক, নেই হাতের গ্লাভস। এভাবেই মেশিনে কয়লা ভাঙছে আর পোড়ানো ইট নাড়ছে শ্রমিকরা। এতে কয়লা ও ইটের গুড়া মুখে ঢুকলে শ্রমিকদের বিভিন্ন রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা আছে। ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ৭৮ এর ক ধারায় মালিক পক্ষকে শ্রমিকদের ব্যাক্তিগত সুরক্ষা যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করে কাজে যোগদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে মালিক একটি রেকর্ড বুক সংরক্ষণ করবেন বলেও উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এই আইনের বিষয়ে মালিকপক্ষের কোনো আন্তরিকতা নেই। 

ইটভাটায় শিশুদের দিয়ে  কাজ করানো ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে ফ্রেন্ডস ট্রেডাসের্র মালিক  ফজলুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান।

আরো দেখা যায়, ইটভাটায় বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি নষ্ট করে ইট তৈরি করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি ট্রাক্টর দিয়ে কৃষি জমির টপ সয়েল (জমির উপরিভাগের মাটি) এনে ইট তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভাটার পাশে স্তুপ করে রাখা হয়েছে মাটি। ভাটার জন্যে ব্যবহারকারী ট্রাক ও ট্রাক্টরের ঘন ঘন যাতায়াতের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে পথচারীসহ স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। ভাটার কুণ্ডলী পাকানো কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশ্রিত ধোঁয়া সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। যত্রতত্র ইটভাটার কারণে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের সন্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন আশপাশের মানুষ।

এলাকাবাসী জানায়, ইটভাটার মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় ভাটা প্রতিষ্ঠাকালে এলাকাবাসী প্রশাসনের কোনো দপ্তরে অভিযোগ দিতে সাহস পাননি। গত কয়েক বছর থেকেই ভাটায় ইট তৈরি ও বিক্রির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এসব ভাটায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসকের নবায়নকৃত লাইসেন্সসহ কোনো কাগজপত্র নেই বলে জানান তারা। 

সেখানকার কৃষক আশরাফ, করিম ও জব্বার মিয়া  বলেন, গত কয়েক বছর আগেও এই জমিতে আমরা ফসল উৎপাদন করেছি। এখন সেখানে তৈরি করা হয়েছে ইটভাটা। এতে শুধু চাষাবাদ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ভাটায় ব্যবহৃত চিমনির নির্গত কালো ধোঁয়ায় ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়েছে।

এ ব্যাপারে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির আহ্বায়ক ও কাজি ব্রাদার্স এর সত্ত্বাধিকারী কাজি মোস্তফা বলেন, আমার জানামতে পাঁচটি ইটভাটার লাইসেন্স আছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর বর্তমানে  ইটভাটার নবায়ন দিচ্ছে না। তাই চলতি বছর কোনো ভাটার লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। শিশুশ্রমের বিষয়ে তিনি জানেন না বলে জানান।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম সায়েম জানান, ইটভাটার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কাজ করলে তাদের শ্বাসকষ্ট, এলার্জি ও ফুসফুসের সংক্রমণসহ বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি হতে পারে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন অপরিকল্পিতভাবে ইটভাটা গড়ে ওঠায় বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে। এসব ভাটায় ইট তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে ফসলি জমির টপ সয়েল। ফলে একদিকে কৃষক হারাচ্ছে বড় অংশের কৃষি জমি। অপরদিকে ভবিষ্যতে ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার সম্ভবনা দেখা দিতে পারে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার দেব শর্মা বলেন, এ উপজেলায় ১০টি ইটভাটা রয়েছে। ভাটার লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয় জানেন। কোনো ইটভাটায় শিশু শ্রম হয়ে থাকলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম বলেন, ভূরুঙ্গামারী উপজেলার দশটি ইটভাটার মধ্যে সাতটির লাইসেন্স নবায়ন আছে। শিশু শ্রমের বিষয়টি নিয়ে মালিক সমিতির সভাপতিকে চিঠি দেয়া হবে। এর পরও বিধিমালা লঙ্ঘন করে কেউ ইটভাটা পরিচালনা করলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেন তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের সহকারী পরিচালক ইউছুফ আলী বলেন, ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কোনো ইটভাটারই পরিবেশ অধিদপ্তরের হালনাগাদ ছাড়পত্র নেই। শুধুমাত্র খোকন ট্রেডার্স নামের ইটভাটাটির ১৭ জানুয়ারি ২০ সাল পর্যন্ত ছাড়পত্র ছিল। এখন একটিরও নেই। ইতোমধ্যে আমরা কয়েকটি উপজেলায় বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়েছি। আমরা সব উপজেলাতেই এই ধরনের অভিযান চালাবো। কেউ যদি আইন অমান্য করে ইটভাটা চালায় তাহলে সঠিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।