Joy Jugantor | online newspaper

রংপুর চিনিকলে হারিয়ে যাওয়া রেলপথের গল্প

খোরশেদ আলম

প্রকাশিত: ২১:১৬, ১৫ জুলাই ২০২২

আপডেট: ২১:২০, ১৫ জুলাই ২০২২

রংপুর চিনিকলে হারিয়ে যাওয়া রেলপথের গল্প

রংপুর চিনিকলের রেললাইন তুলে স্তুপ করে রাখা হয়েছে।

নুরুল ইসলাম ধলুর বয়স এখন ৭০ এর কোঠায়। প্রায় গাইবান্দার মহিমাগঞ্জের রংপুর সুগার মিল এলাকায় যান। পরিচিত অনেকের সাথে কথা বলে প্রধান ফটক থেকেই আবার মলিন মুখে বাড়িতে ফেরেন ধলু। মূল গেটে গেলেও মহিমাগঞ্জের শ্রীপদিপুরের বাসিন্দা ধলু সুগার মিলের পূর্ব দিকে রেললাইন এলাকায় এখন আর তেমন যান না।

হঠাৎ কখনো গেলেও ভাসতে থাকেন স্মৃতির আবহে। তখন ফিরে যান ২৫ বছর আগে। কারণ, যে রেললাইনে তার জীবন-জীবিকায়নের জোগান হয়েছে তা এখন মাটির নিচে। টিকে থাকা একমাত্র ইঞ্জিনটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

১৯৫৪ সালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জে শুরু হয় রংপুর চিনিকলের নির্মাণ কাজ। ২৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে তিন বছর পর শেষ হয় মিলটির নির্মাণ কাজ। ৩৫ একর জমির উপর গাইবান্ধার একমাত্র ভারিশিল্প কারখানা রংপুর চিনিকল গড়ে ওঠে। এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় চিনিকল হিসেবে পরিচিত এটি।

১৯৫৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৬৩ বছরে ২২৯৮৫ দিনের মধ্যে ৫৭৩৯ দিন ঘোরে মিলের চাকা। এ সময়কালে ৫৬ লক্ষ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন আঁখ মাড়াই করে উৎপাদন করা হয় ৪ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন চিনি। যেখানে রেললাইনের ভূমিকাই ছিল অনবদ্য।  

চিনিকল তাদের আখ, চিনি, চিটাগুড়সহ নানাবিধ মালামাল পরিবহনের কাজে ব্যবহারের জন্য গত শতকের পঞ্চাশের দশকে চিনিকল চালুর সময় একটি এবং পরে ষাটের দশকে আরেকটি ছোট রেল ইঞ্জিন আমদানি করে। মিটারগেজ লাইনে চলাচল উপযোগী এ ইঞ্জিন দুটি চিনিকলের ভিতর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ নিজস্ব রেলপথ পেরিয়ে মহিমাগঞ্জ রেল স্টেশনে যাতায়াত করতো।

বিভিন্ন রেলস্টেশন থেকে নিয়ে আসা চিনিকলের কাঁচামাল আখবোঝাই মালবাহী বগি মিলের ভিতরে টেনে আনা এবং মিলের উৎপাদিত চিনি-চিটাগুড় মহিমাগঞ্জ রেলস্টেশনে পরিবহনের তখন একমাত্র মাধ্যম ছিল এই রেলপথ। প্রয়োজনে সারাদিনই এ রেল ইঞ্জিন দুটি যাতায়াত করতো এ পথে।

স্বাধীনতার পরে একটি ইঞ্জিন অকেজো হয়ে পড়লে সেটিকে ফেলে রাখা হয়। এর মধ্যে কোন এক সময় কোটি টাকা মূল্যের এ ইঞ্জিনটি পুরনো লোহা-লক্করের সাথে সামান্য টাকায় স্ক্র্যাপ লোহা হিসেবে বিক্রি করা হয়।

পরবর্তীতে একটি ইঞ্জিন দিয়েই মহিমাগঞ্জ রেলস্টেশন পর্যন্ত চিনিকলের প্রয়োজনীয় পরিবহন কাজ চালিয়ে নেয়া হতো। কিন্তু আশির দশকের শেষের দিকে আখ ও চিটাগুড় পরিবহন অনেকটাই সড়কপথ নির্ভর হয়ে পড়লে রেলপথের গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

নব্বইয়ের দশকে এখানে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় রেলপথ ও রেল গাড়ির ব্যবহার। ব্যবহার না হওয়ার কারণে বন্ধ রেললাইন মাটির নিচে ঘাস আর জঙ্গলে মিলে গেছে। চুরি ঠেকারে দেড় কিলোমিটার রেললাইন তুলে নিয়ে এসে প্রধান ফটকের সামনে স্তুপ করে রাখা হয়েছে। আর রেল ইঞ্জিন মাটি আর ঘাসের সাথে মিতালি করে টিকে আছে। 

রেল ইঞ্জিনটি ১৯৬১ সালে ইংল্যান্ডের প্লানেট কোম্পানির তৈরি। এটি ডিজেল লোকোমোটিভ ইঞ্জিন। দেশে ষাটের দশকে আরও কয়েকটি ইঞ্জিন রয়েছে, সেগুলো ঢাকা ও চট্টগ্রামে। বিশেষ কারণে রেললাইন এসব ইঞ্জিন ব্যবহার করে। তবে টেনের যাত্রী চলাচলের সাথে এসব ইঞ্জিনের এখন কোনো সম্পর্ক নেই। মহিমাগঞ্জের এই ইঞ্জিনটি কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ইতোমধ্যেই নষ্টের পথে।

ঐতিহ্যবাহী এই স্মারক রেল চালকের সহকারি ধলুর মণিকোঠরে এখনো প্রায় কড়া নাড়ে। অনেক রাতে রেলগাড়ির ঝমাঝম শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার।

কথার ছলে ধলু জানান, চিনিকলের দুই ইঞ্জিনের চালক ছিলেন তিনজন। তারা হলেন ছহির উদ্দিন, লয়া মিয়া ও রফিকুল ইসলাম। তাদের বাড়ি শ্রীপদিপুরেই। তারা মারা গেছেন কয়েক বছর হলো।

রংপুর চিনিকলের রেলাইন কিংবা ইঞ্জিনের সাথে গভীর স্মৃতি রয়েছে দুজন মানুষের। একজন শামসুল হক। অন্যজন নুরুল ইসলাম ধলু। তারা দুজনই এই ট্রেন চালকের সহকারি ছিলেন। তবে ধলু সহকারি থাকলেও বেশিরভাগ সময়ই এই ট্রেন চালাতেন। চালক হিসেবে তিনি লালমহিনহাট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ধলু বলেন, 'এই চিনিকলে ১৯৭৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ট্রেন চালকের সহকারি হিসেবে চাকরি করেছি। তবে বেশিরভাগ সময়ই আমি ট্রেন চালিয়েছেন। পুরোপুরি চালক হিসেবে প্রশিক্ষণ আছে আমার। এমনকি রেলের ইঞ্জিন বিকল হলেও ঠিক করতাম আমিই। এসব দিক থেকে ট্রেনের সাথে আমার হৃদয়ের সম্পর্ক। ২৫ বছরের কর্মজীবনে এই রেললাইন ও ইঞ্জিন আমার অনুভূতির অংশ। অন্য সব তো শেষ হয়ে গেছে। এখন একমাত্র এই রেল ইঞ্জিন জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হোক। এটিই আমার চাওয়া।'

লোকসানের মুখে ২০০৪ সালে উৎপাদন বন্ধ  ঘোষণা করা হয় রংপুর চিনিকলের। তারপর স্থানীয়দের আন্দোলনের মুখে মিলটি চালু হয়। তারপর ২০২০ সালে আঁখ মাড়াই স্থগিতের ঘোষণা আসে রংপুর চিনিকলে। এরপর থেকেই মিলের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। এমন বন্ধ চালুর কবলে রেললাইনও একই সমীকরণে চলেছে।

চিনিকলে প্রথম যখন ট্রেন চালু হয় তখন এলাকার মানুষের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ওই সময় ১৮ বছরে যুবক ছিলেন মোজাম্মেল হক। ১৯৮১ সালে এই চিনি কলে চাকরি শুরু করে তিনি। এখন বার্ধক্যের কাছে নতজানু। তবে এখনো রংপুর চিনিকলে ইলেক্ট্রট্রিশিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোজাম্মেল।

ইলেক্ট্রট্রিশিয়ান মোজাম্মেল জানান, 'এই ট্রেন শুধু মালামাল আনা নেওয়ার কাজে ব্যবহার হয়েছে এমন নয়; এর সাথে চিনিকলের সবার আত্মিক বন্ধন রয়েছে। যুবক বয়সে এলাকার সবাই ট্রেনে উঠেই আত্ম বিনোদন নিয়েছেন। ট্রেনের প্রতি কণা লোহার সাথে মহিমাগঞ্জের মানুষের সম্পর্ক রয়েছে। কোনোভাবে অবশিষ্ট রেল ইঞ্জিন রক্ষা করা গেলেও আমাদের আত্মা শান্তি পাবে।'

মনজুর হাবীব মনজু ৪২ বছর ধরে মহিমাগঞ্জে সাংবাদিকতা করেন। প্রবীণ এই সাংবাদিক বলেন,  রেলগাড়ি ঝমাঝম, পা পিছলে আলুর দম। রেল গাড়ি সম্বন্ধে এমন ধারণাই সবার মনে গাঁথা থাকলেও একদা ব্যতিক্রমী কিছু রেলগাড়ি চালু ছিল এ দেশে। ঝমঝম বা বিকট কোন শব্দ তুলে নয়; বরং খুব মিষ্টি, হাল্কা, মৃদুমন্দ সুরেলা ছন্দে এসব রেল ইঞ্জিন চলাচল করত। তার অন্যতম উদারহরণ হলো রংপুর চিনিকলের ট্রেন। এই ট্রেনের ইঞ্জিত অত্যন্ত ভালো মানের। এই কারণে বছরের পর বছর চলেছে এ পথে।

রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরুল কবির বলছেন, এই রেল ইঞ্জিনটি সংরক্ষণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলব। এটি নষ্টের হাত থেকে রক্ষা করা হবে।  

লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগ বলছে, ঐতিহাসিক মানদন্ডে এই ট্রেন ইঞ্জিন অনেক পুরোনো। উত্তরাঞ্চলে (লালমনিরহাট বিভাগে) কোনো স্থানে ১৯৬১ সালের মতো পুরোনো কোনো রেল ইঞ্জিন আর নেই। পাবর্তীপুরে এটি পুরোনো ইঞ্জিন জাদুঘরে রাখার জন্য সংরক্ষণ করা হয়ে সেটিও ১৯৮০ সালের দিকের তৈরি।

লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় যন্ত্র প্রকৌশলী (লোকো) রাসেল আহম্মেদ বলেন, ১৯৬১ সালের কয়েকটি ইঞ্জিন চট্টগ্রাম ও ঢাকাতে রয়েছে। সেগুলো মিটার গ্রেজ লাইনে অল্প পরিসরে মালামাল বহনের কাজে ব্যবহৃত হয়। এগুলোর ঐতিহাসিক মান অনেক। এগুলো সংরক্ষণের জন্য নীলফামারির সৈয়দপুরে রেলওয়ে জাদুঘর হচ্ছে। এটি পূর্ণাঙ্গ হলে রেলে ঐতিহাসিক কিছু জিনিসপত্র সংরক্ষণ করা হবে।