Joy Jugantor | online newspaper

যমুনায় নদীভাঙন

বগুড়ার ৫১০ বিঘা বিলীনের শঙ্কা, বেশি ক্ষতি হবে গাইবান্ধায়

আসাফ-উদ-দৌলা নিওন

প্রকাশিত: ২১:০৯, ১৪ জুন ২০২১

আপডেট: ১৯:০৯, ১৫ জুন ২০২১

বগুড়ার ৫১০ বিঘা বিলীনের শঙ্কা, বেশি ক্ষতি হবে গাইবান্ধায়

মানচিত্রে যমুনা নদী।

এবারও যমুনা নদী ভাঙনের পর নিঃস্ব হওয়ার আশঙ্কার কথা উঠে আসছে গবেষণায়।  তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধায় সবচেয়ে বেশি জমি বিলীন হবে।  সড়ক ভাঙবে বেশি জামালপুরে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেশি পরিমাণ হুমকির মুখে সিরাজগঞ্জের।  এই ভাঙন শঙ্কা থেকে মুক্ত নেই বগুড়া।  জরিপ বলছে, বগুড়ায় এবার শুধু যমুনায় অন্তত ৫১১ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হবে। 

সরকারের একটি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) নদী ভাঙনের পূর্বাভস দিচ্ছে ২০০৪ সাল থেকে। এই আভাস মিলে যায় প্রায় ৭০ শতাংশের উপরে। 

দেশের উত্তরাঞ্চলের যমুনা নদীতে প্রতিবছরে ভাঙছে।  নদী ভাঙনে বসতবাড়ি, ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন যমুনা পাড়ের বহু মানুষ।  ভূমি হারিয়ে হারিয়ে তারা বিচ্ছিন্ন হয়েছেন পরিবার থেকে, নিজের চিরচেনা লোকালয় থেকে।  শুধু তাই নয়; এসব জনপদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক, বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে নষ্ট হচ্ছে সরকারের কোটি কোটি টাকা।  

এক সময় নদী ভাঙনের আগাম কোনো তথ্য কারও কাছে থাকত না। কিন্তু ২০০৪ সালের পর থেকে নদী ভাঙনের এসব ক্ষয়ক্ষতি বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে এখন আগে থেকে জানা সম্ভব হচ্ছে।  

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় সিইজিআইএস দেশের প্রধান তিনটি যমুনা, পদ্মা ও গঙ্গা নদীর তীর ভাঙন এবং রূপগত পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিয়ে থাকে।  

সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নদনদীর গতিপথ অনুসরণ করে পাওয়া এসব পূর্বাভাসের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সত্যতাও মিলে। বন্যার স্থায়ীত্ব বাড়লে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ে।  

ইতিমধ্যে উজানের ঢলে দেশের উত্তরাঞ্চলের নদনদীতে পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। গেল বছরের কয়েক দফা বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির রেশ কেটে উঠতে না উঠতেই এবারের বর্ষার মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। এই ভাঙন শুধু এখনকার নয়।  নদী সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই চলছি। আর নদীপাড়ের মানুষ ক্রমাগত নিঃস্ব হচ্ছে। 

সিইজিআইএস বলছে, এই ভাঙন ক্রমাগত থাকবে। তবে আগাম পূর্বাভাস দিলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া সুযোগ থাকে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কমছে। 

ব্রক্ষপুত্রের প্রধান শাখা নদী যমুনা নদী পথের কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জ এই সাতটি জেলার ক্ষয়ক্ষতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে। 

গতমাসে প্রকাশিত সিইজিআইএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- যমুনা নদী ভাঙনে মোট ৩ হাজার ৭৭২ মিটার বাঁধ নষ্ট হতে পারে।  এর মধ্যে গাইবান্ধা জেলার বাঁধের পরিমাণ ৩ হাজার ১২৭ মিটার।  এরপরে সিরাজগঞ্জের ৪৭৫ মিটার এবং কুড়িগ্রামের ১৭০ মিটার বাঁধ নদী ভাঙনের শিকার হবে।  

প্রতিবেদনটিতে মোট ১ হাজার ২৬৩ হেক্টর জমি বিলীনের শঙ্কা করা হয়েছে।  এর মধ্যে টাঙ্গাইলের ৪৯৪ হেক্টর ভূমি ক্ষতির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। আর উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা জেলার সবচেয়ে বেশি ভূমি বিলীনের কথা বলা হয়েছে; পরিমাণ ২৯১ হেক্টর।  এরপরে রয়েছে সিরাজগঞ্জে ২২০ হেক্টর, জামালপুরে ১১৪ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ৭২ হেক্টর, বগুড়ায় ৬৯ ও মানিকগঞ্জে ৩ হেক্টর।  

সড়কপথের মোট ক্ষয়ক্ষতির অনুমান করা হয়েছে ৫ হাজার ২৭৩ মিটার।  এর মধ্যে জেলা সড়ক ৩ হাজার ৪৯১, উপজেলা সড়ক ৭৬৯ ও গ্রামীন সড়ক  ১ হাজার ১৩ মিটার। 

জেলাভিত্তিক সড়কের ক্ষতির পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে জামালপুর। এর জেলা সড়কে ১ হাজার ৯০৪ ও গ্রামীন সড়কে ১৬৩ মিটার নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরের ধাপে টাঙ্গাইলের জেলা সড়কে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ১ হাজার ৩৮০ ও গ্রামীন সড়কে ৩২১ মিটার। 

এ পূর্বাভাসে সড়ক অংশে উত্তরাঞ্চলের মধ্যে সিরাজগঞ্জ জেলার বেশি ক্ষতির কথা ইঙ্গিত করা হয়েছে। জেলা সড়ক ১৭৮ ও উপজেলা সড়ক ৭৬৯ মিটার বিলীনের হুমকিতে রয়েছে। আর বলা হয়েছে গাইবান্ধার ৫২৯ মিটার গ্রামীন সড়ক নদী ভাঙনে পড়তে পারে।  

এ ছাড়া সিইজিআইএস শঙ্কা করছে সাত জেলায় মোট ২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হতে পারে, এর মধ্যে সিরাজগঞ্জেরই ১৭টি। এ ছাড়া ৪টি হাটবাজার, ২টি সরকারি দপ্তর, ১৫টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নদী ভাঙনের শিকার হতে পারে। 

গত বছর যমুনার ভাঙনের মুখে পড়ে এই স্কুলটি। ফাইল ছবি।

তবে নদী ভাঙনের পরিস্থিতি কিছুটা প্রতিরোধ করা যায়। এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমে আসবে। গবেষকদের ভাষ্য, এ কাজে জেলাভিত্তিক সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সম্মিলিতভাবে এগিয়ে এলেই তা সম্ভব।  

সিইজিআইএসের গবেষকেরা বলছেন, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে দেশে নদীভাঙন কমছিল। এমনকি বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, চাঁদপুর থেকে শরীয়তপুরের মতো তীব্র ভাঙনপ্রবণ এলাকায়ও ভাঙন অনেকটা কমে যায়। ওই তিন বছর ভাঙনকবলিত এলাকায় নতুন বাঁধ নির্মাণ, মেরামতসহ বিভিন্ন ধরনে অবকাঠামো নির্মাণ করেছিল সরকার। এর ফলে ভাঙন কমে আসে। ওই তিন বছর দেশে তীব্র বন্যা হয়নি।  কিন্তু ২০২০ সালে এসে পরিস্থিতি আবার পাল্টাতে থাকে।

সিইজিআইএসের সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশের ১ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে। এতে প্রায় ১৭ লাখ ১৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

নদী ভাঙন পরিস্থিতি নিয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, বিগত সময়ের বন্যায় ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বেশিরভাগই মেরামত করা হয়েছে।   

গাইবান্ধা সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার নদী ভাঙনপ্রবন এলাকায় সর্তকতামূলক ৪০০ কোটির টাকার একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে।  এর প্রায় ১০ শতাংশ অর্থের ব্যয়ে সাড়ে ৪ কিলোমিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। 

নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, ভাঙনপ্রবন স্থান হিসেবে ভুসিরভিটা নামে একটি পয়েন্ট রয়েছে। এখানে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য একটি কাজের টেন্ডার হয়েছে। এটি সম্পন্ন হলে নদীভাঙনের দুশ্চিন্তা কমে যাবে।  

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির বলেন, জেলায় প্রায় ৪৫ কিলোমিটার যমুনা নদীর অংশে কয়েকটি সেকশকন করা আছে। এখানকার ভাঙনপ্রবন এলাকাগুলো প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করা হয়।  কোথাও প্রয়োজন হলে জিও ব্যাগ, ব্লক দিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হয়। 

সিইজিআইএসের পূর্বাভাস প্রায় ৮০ শতাংশ কার্যকর হয়।  এ জন্য বর্ষার আগে থেকে আমরাও ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে রাখি বলে জানালেন হুমায়ুন কবির।  

সিইজিআইএসের সহযোগী বিশেষজ্ঞ সুদীপ্ত কুমার জানান, গত বছর সিইজিআইএস দেশের ১৩টি জেলায় ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভাঙনের মুখে পড়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল। চার দফা বন্যার কারনে বাস্তবে ভেঙেছে ৩৮ বর্গকিলোমিটার।  যখন দুর্যোগের স্থায়ীত্ব বেশি হয় তখন ক্ষতির পরিমাণও বাড়ে।  

পূর্বাভাসের প্রতিবেদন নিয়ে সুদীপ্ত কুমার বলেন, আমাদের তথ্যগুলো পাউবোসহ অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজেদের কাজে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করে।  এ থেকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব।