Joy Jugantor | online newspaper

বিকাশ ব্যবহারে বাঁচছে সময়: বগুড়ার গ্রাহকেরা 

আসাফ উদ-দৌলা নিওন 

প্রকাশিত: ১৫:২৬, ২৭ অক্টোবর ২০২১

আপডেট: ১৫:৪২, ২৭ অক্টোবর ২০২১

বিকাশ ব্যবহারে বাঁচছে সময়: বগুড়ার গ্রাহকেরা 

বগুড়া শহরের সাতমাথা এলাকার সপ্তপদী মার্কেট।

বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে যমুনা নদী এলাকার বাটির চরে বাস মোখলেছুর রহমান। সংসার, কৃষিকাজে হুটহাট টাকার প্রয়োজন পড়ে যায়। ছেলে আবু সাইদ জেলার বাইরে চাকরি করেন। এ জন্য সহজে টাকা পাঠানোর জন্য বাবা মোখলেছের মোবাইলে বিকাশ হিসাব খুলে দেন। 

মোখলেছুর রহমান বলেন, বিকাশের গুরুত্ব বুঝেছিলাম করোনা কারনে লকডাউনের সময়। সবকিছু বন্ধ ছিল। শহর তো দূরে থাক; উপজেলা সদরে যাওয়াও কঠিন ছিল। এখন সংসারের টুকিটাকি আর্থিক লেনদেন বিকাশেই করতে হয়। চাষের জন্য সার, বীজ কেনাকাটায় বেশিরভাগ সময় টাকা বিকাশেই দিয়ে থাকি।

মোবাইল আর্থিক সেবা ‘বিকাশ’ সুফল এখন শহর ও গ্রামে-গঞ্জে সমান তালে চলছে। বিকাশ এখন মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবন ব্যবস্থার যেন গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।  বিভিন্ন জরিপে ও গবেষণায় বিকাশ ব্যবহারের ইতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। এসব জরিপে দেখা গেছে, বিকাশ ব্যবহারে মাথাপিছু আয় আগের থেকে বেড়েছে।  

সাধারণ মানুষের কাছে বিকাশ শুধু মোবাইল আর্থিক হিসাব নয়। এটি ডিজিটাল ওয়ালেট। বিকাশে লেনদেন করার ফলে সময়, শ্রম ও অর্থ সবই বাঁচে। 

বগুড়া শহরের নাটাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম অনলাইনে ফিল্যান্সার হিসেবে কাজ করেন। তাকে বেশির ভাগ কম্পিউটারের সামনে বসে থাকতে হয়। দৈনন্দিন লেনদেনজনিত অনেক কাজের সাথে নিজের সময় মেলাতে পারেন না।  এ জন্য বিকাশ তার পছন্দের মাধ্যম।

শফিকুল ইসলাম বলেন, সাধারণত এখন পকেটে আলাদা করে টাকা রাখতে হয় না। বিকাশই আমার ওয়ালেট। ছোটখাট কেনাকাটা বা পেমেন্ট বিকাশে করে থাকি।  

শফিকুলের ভাষ্য, প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের জীবনকে গতিশীল করে তুলছে। বিকাশ এই গতিশীলতাকে আরও সহজ করেছে। 

বিকাশ ব্যবহারের তালিকায় শুধু পুরুষেরা নেই। নারীরাও অনেক এগিয়েছে। শহরের কলোনী এলাকার মহসিনা আকতার নামে গৃহিনী বলেন, আগে গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল দিতে ব্যাংকে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। বিল দিতে যাওয়া মানে অর্ধেক দিন শেষ। এখন শুধু মোবাইলে কয়েক সেকেন্ডের আঙুলের ছোঁয়ায় বিল পেমেন্ট শেষ। 

এ ধরনের সুবিধার কথা শুধু এই কয়েক জনের নয়। বগুড়ার আরও অনন্ত ২০ জন নারী-পুরুষের সঙ্গে বিকাশ ব্যবহার নিয়ে কথা হয়েছে। তারাও এসব সুবিধার কথা জানিয়েছেন। মূলত, করোনা মহামারীর সময় লকডাউনের পর থেকে বিকাশের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি বেড়েছে বলে জানান গ্রাহকেরা।

বিকাশের কর্তৃপক্ষ সূত্র বলছে, দেশে এখন প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি বিকাশের গ্রাহক রয়েছেন। আর এজেন্ট রয়েছে প্রায় তিন লাখ। সব ধরনের আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কার্যমের বিকাশ ব্যবহার হচ্ছে। গড়ে প্রতিদিন ৮০ লাখ থেকে এক কোটি বার ট্রান্সজেকশন করছে বিকাশ ব্যবহারকারী। 

গত ১০ বছরে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান বিকাশের প্রভাব নিয়ে সমীক্ষাটি করা হয়। এতে দেখা যায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কারনে নারী-পুরুষের ব্যবধান কমেছে। এ ক্ষেত্রে এমএফএস বা মোবাইল ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

পিআই স্ট্র্যাটেজি ডট ওআরজির হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে (জানুয়ারি-২০২১) ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব আছে। আর মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব আছে ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের, যাদের অনেকের ব্যাংক হিসাবও আছে।

বিকাশের কর্তৃপক্ষ সূত্র বলছে, দেশে এখন প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি বিকাশের গ্রাহক রয়েছেন। আর এজেন্ট রয়েছে প্রায় তিন লাখ। সব ধরনের আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কার্যমের বিকাশ ব্যবহার হচ্ছে। গড়ে প্রতিদিন ৮০ লাখ থেকে এক কোটি বার ট্রান্সজেকশন করছে বিকাশ ব্যবহারকারী।

এ ছাড়া বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বিকাশ ব্যবহারের ফলে পারিবারিক পর্যায়ে অকৃষি (নন-ফার্ম) আয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। বিকাশ ব্যবহারের সুবাদে মৎস্য চাষ থেকেও পারিবারিক আয় বেড়েছে। আয়ের পাশাপাশি ভোগের ক্ষেত্রেও বিকাশ ব্যবহারের প্রভাব রয়েছে।

যেসব খানা বা পরিবার বিকাশ ব্যবহার করে এবং যারা ব্যবহার করে না, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন অভিঘাতের সময় তাদের আয়, ব্যয় ও ভোগের ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে গবেষণায়। দেখা গেছে, যেসব পরিবার অভিঘাতের সময় বিকাশ ব্যবহার করেনি, তাদের অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্স কমেছে ৬১ শতাংশের বেশি। মাথাপিছু আয় কমেছে ১৭ শতাংশ। তবে মাথাপিছু ভোগে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।

অন্যদিকে, যেসব পরিবার অভিঘাতের সময় বিকাশ ব্যবহার করেছে, তাদের অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্স ৬০ শতাংশ বেড়েছে। পরিণতিতে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ২৮ শতাংশ। একই সঙ্গে মাথাপিছু ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ।

বিকাশ ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশন্স শামসুদ্দিন হায়দার ডালিমের সঙ্গে কথা হয়। এক কথায় বিকাশ গ্রাহকের কাজ সহজ করে স্বাধীনতা ও কর্মক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। 

গ্রাহকের সেবার মান নিয়ে শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত এই মোবাইল আর্থিক সেবাকে সহজতর করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। দেশের রেমিট্যান্স থেকে শুরু করে কর্মীদের বেতন বিকাশে পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে গ্রাহকের সময় কমিয়েছে, আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করছে।  

এ ছাড়া প্রান্তিক মানুষদের বিকাশ ব্যবহারে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে সারাবছর প্রচারণা চলে আমাদের। এতে মানুষরা সচেতন হচ্ছে। গ্রাহকরাও আগের চেয়ে অনেক বেশি মোবাইল সেবা ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছে।     

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বিকাশ দেশের মানুষকে আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক অর্ন্তভুক্ত করেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন মানুষের লেনদেনও এখন জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।