Joy Jugantor | online newspaper

দড়িতে ভরসা বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের রেলক্রসিং পারাপারে

আব্দুল আউয়াল

প্রকাশিত: ২১:২৭, ৩ আগস্ট ২০২২

আপডেট: ১২:১৫, ৪ আগস্ট ২০২২

দড়িতে ভরসা বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের রেলক্রসিং পারাপারে

দুর্ঘটনা এড়াতে সিগন্যাল বারের বদলে দড়ি ব্যবহার করছেন গেটম্যান।

বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের মূল ফটকের সামনে রেলপথের লেভেল ক্রসিং বছরের পর বছর ধরে অরক্ষিত ও অনুমোদনহীন অবস্থায় রয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে এই ক্রসিং এ সিগন্যাল বারের বদলে দড়ি ব্যবহার করছেন একজন গেটম্যান। 

তবে তিনি রেল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ নন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিবেচনায় নিজেদের এক কর্মচারীকে দায়িত্ব দিয়েছে কলেজ। 

কলেজের মূল ফটকের রেলপথের লেভেল ক্রসিংটি অনুমোদনহীন হওয়ায় কলেজ কর্তৃপক্ষ নিজস্বভাবে ২টি বাঁশের সিগন্যাল বার ব্যবহার করে আসছিল। তবে মাস দেড়েক আগে সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য বর্তমানে গেটম্যানের দায়িত্বে থাকা বিনয় সরকারকে দড়ি দিয়ে সিগন্যাল বারের কাজ সারতে হচ্ছে।

বিনয় সরকারের সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি মাস্টার রোলে কলেজে একজন কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। তবে দুই বছর হলো এই রেলপথে লেভেল ক্রসিং এ গেটম্যান হিসেবে কাজ করছেন তিনি। কলেজ কর্তৃপক্ষ এই গেট দিয়ে চলাচলকারীদের নিরাপত্তার বিবেচনায় তাকে এখানে দায়িত্বে রেখেছে। 

সরকারি আজিজুল হক কলেজ সূত্র জানায়, মূল ফটকের সামনের লেভেল ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করেন। এছাড়াও কলেজের শিক্ষক, কর্মচারী, বিভিন্ন দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও দর্শনার্থীসহ প্রতিদিন অন্তত আরও ৫ হাজার ব্যক্তি এই পথে চলাচল করেন। কলেজের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সুবিধার জন্য ৬ টি বাস রয়েছে। প্রতিটি বাস এই লেভেল ক্রসিং দিয়ে দিনে অন্তত ৪ বার যাওয়া আসা করে থাকে। 

কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, এভাবে প্রতিনিয়ত জীবনের শঙ্কা নিয়ে এই লেভেল ক্রসিং ব্যবহার করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সবার। এজন্য দুর্ঘটনা এড়াতে কলেজের একজন কর্মচারী সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত এই লেভেল ক্রসিং এ দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে অন্তত ৮ বার ট্রেন চলাচল করে থাকে। এরপরে দিনের অন্য সময়ে এই ক্রসিংটি একদমই অরক্ষিত থেকে যায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি আজিজুল হক কলেজের মূল ফটকের সামনের রেলপথে রয়েছে লেভেল ক্রসিং। তবে সেটি অরক্ষিত ও অনুমোদনহীন হওয়ায় সেখানে কোন সিগন্যাল বার বা গেটম্যান নেই। এই পথেই প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। কলেজ ক্যাম্পাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা শঙ্কায় রয়েছেন। 

সিগন্যাল ম্যানের দায়িত্বে থাকা কলেজের কর্মচারী সময় বিবেচনায় রেলপথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকেন। নিদির্ষ্ট একটি দূরত্ব থেকে রেলগাড়ির দেখা পাওয়ার পর তিনি দড়ি দিয়ে রেলগেটের দুইপাশ বেঁধে দেন। এরপর বাঁশি বাজিয়ে দুইপাশের যাতায়াতকারীদের সতর্ক করেন বিনয়। 

দুপুরে সাকিব প্রধান সরকারি আজিজুল হক কলেজের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়। পৌণে ৩টার দিকে কলেজের মূল ফটকের রেলক্রসিংয়ে তিনিও আটকা পড়েন। 

সাকিব জানান, প্রতিদিন এভাবে বাঁশি শব্দ ও জনাকীর্ণ দড়ি দেখে দাঁড়িয়ে যেতে হয়। বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই ভয়ানক। আমি প্রতিদিন যাওয়া-আসা করি এজন্য আমি দড়ি সহজেই বুঝতে পারছি। তবে অচেনা কেউ এই পথে আসলে দুর্ঘটনার কবলে পড়বেন। 
সরকারি আজিজুল হক কলেজের বাসচালক পান্না মিয়া জানান, স্থায়ীভাবে লেভেল ক্রসিং না থাকায় আমাদের নিরাপত্তা শঙ্কা থেকে যায়। যদি সেখানে রেলওয়ের গেটম্যান ও সিগন্যাল বার থাকতো তাইলে আমাদের জন্য ভালো হতো। 

এসব সমস্যার কথা স্বীকার করেন সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর শাহজাহান আলী। তিনি বলেন, আমরা এখনও এই লেভেল ক্রসিং বৈধ করার জন্য ও সিগন্যালবারসহ গেটম্যানের বিষয়ে রেলওয়কে তাগাদা দেইনি। অতিশীঘ্রই তাদের জানানো হবে। বর্তমানে আমারা নিজেদের উদ্যোগে একজন অস্থায়ী গেটম্যান রেখে দিয়েছি। পাশাপাশি সিগন্যাল বার হিসেবে আমাদের নিজেরা সেখানে বাঁশ দিয়েছিলাম। বাঁশগুলো নষ্ট হওয়ায় আপাতত দড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে দ্রুত আমারও সেখানে কার্যকরি কোন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমরা ব্যবস্থা নেব।

বগুড়া রেলওয়ে প্রকৌশলী কার্যালয় থেকে জানা যায়, বগুড়ায় সোনাতলা থেকে সান্তাহার এরিয়া পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথ রয়েছে। এই পথে অনুমোদীত ৪৮ টি ও অনুমোদনহীন ২৫ টি লেভেল ক্রসিং আছে। এরমধ্যে সরকারি আজিজুল হক কলেজের মূল ফটকের সামনে লেভেল ক্রসিংটি অনুমোদনহীন ও অরক্ষিত। এজন্য সেখানে রেলওয়ের কোন সিগন্যালবার বা গেটম্যান দায়িত্ব পালন করে না। 

কার্যালয় সূত্র আরও জানায়, সরকারি আজিজুল হক কলেজের মূল ফটকের প্রায় ৩০০ গজ পূর্বে কামারগাড়িতে লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এই ক্রসিং রেলওয়ে বিভাগের স্পেশাল ক্যাটাগরিতে পড়ে। সেখানে দুইপাশে সিগন্যাল বারসহ ২৪ ঘণ্টায় ৩ জন গেটম্যান দায়িত্ব পালন করেন। মূল ফটকের লেভেল ক্রসিং রেলওয়ে বিভাগের তৈরি করা নয়। পাশাপাশি স্থানটির গুরুত্ব বিবেচনায় কলেজ কর্তৃপক্ষও কখনও রেলওয়ে বিভাগকে অবহিত করেনি।

এ বিষয়ে সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান জানান, কলেজের মূল ফটকের লেভেল ক্রসিং অনুমোদনহীন। এজন্য সেখানে আমাদের গেটম্যান বা সিগন্যাল বার নেই। কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের স্থানটির গুরুত্ব বিবেচনায় কখনও অবগত করেনি। উনারা স্থানটির গুরুত্ব তুলে ধরে আমাদের অবগত করলে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।