Joy Jugantor | online newspaper

বাংলাদেশকে প্রথম

‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ কী কিসিঞ্জার বলেছিলেন, নাকি অন্য কেউ 

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১০:৪৬, ৩০ নভেম্বর ২০২৩

‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ কী কিসিঞ্জার বলেছিলেন, নাকি অন্য কেউ 

বাংলাদেশকে প্রথম ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ কী কিসিঞ্জার বলেছিলেন, নাকি অন্য কেউ

সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলার অপবাদ দেয়া হয় সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে। তবে বিতর্ক রয়েছে, আসলে তিনি কী প্রথমবারের মতো এমনটি বলেছিলেন নাকি অন্য কেউ। বলা হয়ে থাকে, চূড়ান্ত স্বাধীনতার ঠিক ১০ দিন আগে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে দক্ষিণ এশিয়া পরিস্থিতি নিয়ে তখনকার মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের সভাপতিত্বে ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের সভায় প্রথমবার বাংলাদেশকে (পূর্ব পাকিস্তান) ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বা ‘বাস্কেট কেস/ বটমলেস বাস্কেট’ হয়। আর সেই বৈঠকে উপস্থিত আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট ও জাপানে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউ এলেক্সিস জনসন প্রথমবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ‘বাস্কেট কেস’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। যার সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন কিসিঞ্জার। 

বৈঠকে বক্তব্য রাখার সময় মার্কিন সেনাপ্রধান চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল উইলিয়াম ওয়েস্টমোরল্যান্ড বলেন, ১৯৭২ সালের মার্চের মধ্যে বাংলাদেশে আরও অনেক ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।

তার জবাবে জাপানে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউ এলেক্সিস জনসন বলেন, সেটা (বাংলাদেশ) হবে একটা ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস। যেখানে বৈদেশিক সহায়তার কোনো হিসাব-নিকাশ থাকবে না। 

এলেক্সিস জনসনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে কিসিঞ্জার বলেছিলেন, বাংলাদেশ শুধু আমাদের (যুক্তরাষ্ট্র) বাস্কেট কেস না। ওই সভায় উপস্থিত সবার চেয়ে পদাধিকার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন কিসিঞ্জার। সেই কারণেই হয়তো তার সভাপতিত্বে হওয়া বৈঠকে সব আলোচনায় দায়ভার এড়াতে পারেননি কিসিঞ্জার। সেই থেকে লোকমুখে চালু হয়ে যায়, কিসিঞ্জারই প্রথম তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ বাংলাদেশের ওপর চাপিয়েছেন।  

সেই বৈঠকের পর থেকেই বাস্কেট কেস বা তলাবিহীন ঝুড়ি কথাটা বাংলাদেশের হয়ে যায়। অর্থাৎ, দেশটিতে যে সহায়তা দেয়া হোক, তা ঝুড়ির ফুটো দিয়ে পড়ে যাবে। এরপর থেকে দীর্ঘ বছর পর্যন্ত প্রসঙ্গ এলেই বাংলাদেশকে বলা হতো বাস্কেট কেস। তবে এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলার জন্য এককভাবে হেনরি কিসিঞ্জারকে দায়ী করলেও আসলে কথাটা তার নিজে ছিল না। 

১৯৭১ সালের সেই বৈঠকের পর প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলোতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এলেই ‘বাস্কেট কেস’ বলে উল্লেখ করতে শুরু করে। ১৯৭২ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশের খাদ্যসংকট ও খাদ্য সহায়তা নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত নিবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘বাস্কেট’। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমটির সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল, ‘ওয়ান ম্যান’স বাস্কেট কেস’।

স্থানীয় সময় বুধবার (২৯ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্ষীয়ান এই কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার মারা গেছেন। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ১০০ বছর ছয় মাস। একটি বিবৃতিতে রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা ‘কিসিঞ্জার অ্যাসোসিয়েটস’ জানিয়েছে, জার্মান বংশোদ্ভূত সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যে তার নিজ বাড়িতে মারা গেছেন। তবে এতে তার মৃত্যুর কারণ জানানো হয়নি।

চলতি বছর ২৭ মে এক’শ বছর পূর্ণ করেন বর্ষীয়ান এই কূটনীতিক। জার্মান বংশোদ্ভুত মার্কিন নাগরিক বিভিন্ন সময় সেনা সদস্য, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও কূটনীতিক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

অনেকের কাছে নন্দিত হলেও কারও কারও কাছে নিন্দিত হয়ে আছেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে শান্তির বার্তার বাহক যুক্তরাষ্ট্র তার নেতৃত্বে ফের সর্বোচ্চ শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রভাব বলয় নিয়ে সক্রিয় হয় বিশ্বরাজনীতিতে। কোনো কোনো সময় নৈতিক কূটনীতির বাহক হলেও কখনও আবার বিভিন্ন দেশে উসকে দিয়েছেন বৈপ্লবিক সংগ্রাম ও ইন্ধন দিয়েছেন সামরিক জান্তা সরকারকে।

তার কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বৈচিত্রপূর্ণ জীবনকে একটি প্রবন্ধে প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। তার কূটনৈতিক কার্যাবলীর নথিপত্রের আনুমানিক ওজন ৩০ টন।

১৯২৩ সালের ২৭ মে জার্মানির শহর নুরেমবার্গের অদূরে হেনরি কিসিঞ্জারের জন্ম । নাৎসি জার্মানির শাসনামলে তাদের শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলায় অংশ নিতে চাইত না শিশু কিসিঞ্জার। সেই সঙ্গে ইহুদিদের ওপর নাৎসিদের চাপিয়ে দেয়া বিধিনিষেধের প্রতিবাদ করতেন তিনি।

ত্রিশ দশকের শুরুতে  যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৈশ স্কুলে ভর্তি করা হয় তাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটায় তার উচ্চশিক্ষায় বাধা হয়ে আসে। এ সময় সমরকালীন বিশেষ সেনা হিসেবে কাজে যোগ দেন তিনি। পরে তাকে পদোন্নতি দিয়ে প্রশাসনিক কাজে নিয়ে আসা হয়। এভাবে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার অনুরাগ ও আনুগত্য বাড়তে থাকে। নিজেকে মূল আমেরিকান হিসেবে ভাবতে শুরু করেন তিনি।

১৯৬৯ সালে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়ার পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তার উচ্চশিক্ষা এ ক্ষেত্রে তাকে নানানভাবে সহায়তা করে।

কূটনীতিতে কিসিঞ্জারের দূরদর্শিতা এবং অভিনব পন্থা তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোন স্থায়ী বন্ধু কিংবা শত্রু নেই। আছে শুধু জাতীয় স্বার্থ। এমন নীতির মাধ্যমে নৈতিক ও আদর্শিক কূটনীতিকে পাশ কাটিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাস্তবধর্মী ও জাতীয়তাবাদী পররাষ্ট্রনীতির প্রবর্তক। 

উনিশ শতকের বৈশ্বিক রাজনীতি ও নব্য সাম্রাজ্যবাদের চর্চায় তার বাস্তবধর্মী নীতিমালা হয়ে ওঠে মূল দর্পন। ১৯৭৩ সালে হেনরি কিসিঞ্জারকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়াকে তার নেয়া অভিনব কূটনীতিক কৌশলের প্রতি রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন অনেকে।

নিক্সন, চৌ এন লাই ও মাও সে তুংয়ের মধ্যে ১৯৭২ সালের ঐতিহাসিক সম্মেলনের ধারাকে আরও এগিয়ে নিতে হেনরি কিসিঞ্জার চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অচল কূটনীতিক সম্পর্ককে পুনরায় চালু করেন। স্নায়ূযুদ্ধের সেই ঐতিহাসিক বিরোধিতাকে নির্মূল করে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও রাশিয়ার সঙ্গে আঁতাত করে ফেলেন। সেই একই সময়ে কিসিঞ্জার চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানে ইন্ধনদাতার ভূমিকা রাখেন।

একই সঙ্গে আরব দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ইসরায়েলে বিপুল পরিমাণে সামরিক অস্ত্র ও গোলা সরবরাহ করে। ওই অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় এমন ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তিনি। এর পর কোন আরব দেশ ইসরায়েলে সরাসরি হামলা চালানো থেকে বিরত থাকে।

চিলির সামরিক অভ্যুত্থান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান,পূর্ব তিমুর ও কম্বোডিয়ার বোমা হামলায় হেনরি কিসিঞ্জারের বিতর্কিত সম্পৃক্ততা এখনও বিশ্বরাজনীতিতে তাকে নিন্দিত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

একাধারে নিন্দিত ও নন্দিত হওয়া এমন একজন বর্ণাঢ্য কূটনীতিকের পক্ষেই সম্ভব। এটা স্পষ্টই বলা যায় তার সময়কালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নব্য সাম্রাজ্যবাদ ও বলয়কে অনেক বেশি বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।