Joy Jugantor | online newspaper

৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা চলছে

ডেস্ক রির্পোট

প্রকাশিত: ২১:৩১, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা চলছে

৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা চলছে

নরসিংদীতে প্রায় ৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা চলছে। শহরের কাউরিয়াপাড়ায় মেঘনা নদীর তীরে বাউল আখড়াধামে এ মেলা শুরু হয় গত রোববার। মেলায় এরই মধ্যে সমবেত হয়েছেন ভারতসহ দেশে বিদেশের শতাধিক বাউল। মেলা উপলক্ষে মেঘনার পাড়ে খাবারসহ বিভিন্ন পণ্যের স্টল নিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। 

ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলায় আত্মশুদ্ধি আর আত্বমুক্তির লক্ষ্যে বাউলদের কীর্তন, গীতা পাঠসহ ধর্মী আচার-অনুষ্ঠান চলছে। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে মানব ধর্ম ও সাম্যের জয়ধ্বনী করছেন বাউলরা। দেশ-বিদেশে ভক্তদের উপস্থিতিতে বাউল ঠাকুরের আঁখড়া পরিণত হয় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মিলনমেলায়। 

নরসিংদী শহরের কাউরিয়াপাড়ায় মেঘনা নদীর তীরে বাউল আঁখড়াধামে গত রোববার রাতে প্রথম বাতির মধ্য দিয়ে এ মেলা শুরু হয়।  বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) প্রসাদ বিতরণ করা হবে। আগামী বৃহস্পতিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) মেলা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। 

বাউল ঠাকুরের আখড়াবাড়ি সূত্রে জানা গেছে , প্রতি বছরই মাঘী পূর্ণিমার দিনে শ্রী চৈতন্য দেবের জন্ম তিথী উপলক্ষে এই মহাযজ্ঞের আয়োজন করা হয়। প্রায় ৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মেলাকে ঘিরে নরসিংদীর কাউরিয়াপাড়া এলাকার মেঘনা নদীর তীরে সমাগম ঘটে লক্ষাধিক নারী-পুরুষের। নদীতে চলে পূণ্যস্নান । বাউল ঠাকুরের আঁখড়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাউল শিল্পীরা এসে গান পরিবেশন করেন।

মেলাকে ঘিরে মেঘনা নদীর পাড় ঘেষে জমে ওঠে খেলনা, কুটির শিল্প, মৃৎশিল্প, কাঠ-বাঁশ ও মাটির তৈরী সামগ্রীর হরেক রকম দোকানের পসরা। এছাড়াও শিশুদের আকৃষ্ট করতে মেলায় বসেছে পুতুল নাচ, নাগর-দোলাসহ নানা বিনোদন মূলক রাইড্স। বাউল ভক্তরা সারি বেঁধে মহাযজ্ঞানুষ্ঠানে ঘি-প্রদীপ, মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালিয়ে পুজো দিচ্ছে আর প্রার্থনা করছে পরিবার ও দেশের সব মানুষের কল্যাণ্যের জন্য। 

কথিত আছে, ৭০০ বছর আগে নরসিংদীতে এক বাউল ঠাকুর ছিলেন। তিনি নিজেকে শুধু বাউল বলেই পরিচয় দিতেন। এজন্য বাউল ঠাকুরের প্রকৃত নাম জানেন না এখানকার কেউই। সেই বাউল ঠাকুরের স্মরণে তার আখড়া ধামে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই বাউল মেলা। তবে কে প্রথম এখানে বাউল মেলার আয়োজন করেন তার প্রকৃত তথ্য কারোই জানা নেই । সর্বশেষ ব্রিটিশ শাসনামল থেকে এখন পর্যন্ত মেলার আয়োজন করছেন স্বর্গীয় মনিন্দ্র চন্দ্র বাউলের পরিবার। বর্তমানে এই মেলায় আয়োজকদের মধ্যে রয়েছেন মনিন্দ্র চন্দ্র বাউলের পরিবারের সদস্য শীর্ষেন্দু বাউল পিন্টু, মলয় বাউল রিন্টু ও স্বপন বাউল।

বাউল ভক্ত ও দর্শনার্থী জানায়,  এ আখড়ায় বাউল ঠাকুরের অন্তর্ধান হয়েছিল। বাউল আখড়ায় জগন্নাথ দেবতার মন্দির রয়েছে। মন্দিরে মহাবিষ্ণুর পূর্ণাঙ্গ প্রতিমা, জগন্নাথ দেবতার প্রতিমা, মা গঙ্গার (৩৩ কোটি দেবতার) গট, নাগ দেবতার বিগ্রহ ও শিবলিঙ্গ রয়েছে, যা বাউল ঠাকুর নিজে প্রতিস্থাপন করে গেছেন বলে কথিত রয়েছে। পাশে রয়েছে বাউল ঠাকুর ও মাতাজির সমাধি মন্দির। সবার মধ্যখানে রয়েছে উপাসনার জন্য বিশাল আটচালা বৈঠক ঘর। 

বুধবার দেবতা ব্রহ্মার পূজা মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয় মেলায়। মহাযজ্ঞে জগতের কল্যাণের জন্য ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের পূজা করা হয়। ঠাকুরের কাছে দেশ ও মানুষের কল্যাণে প্রার্থনা করা হয়।

এদিকে বাউল মেলা উপলক্ষে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা মুখরোচক খাবার নিয়ে হাজির হয়েছেন। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে আমিত্তি, জিলেপি, সন্দেশ, বারো মিঠাই, দই, মুড়ালি, গুড়ের তৈরি মুড়ি ও চিড়ার মোয়া, তিলের মোয়া, তিলের সন্দেশ, খাস্তা, কদমা, নারকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু, খাজা, গজা, নিমকি, মনাক্কা, গাজরের হালুয়া, পিঠাসহ রকমারি খাবার। এছাড়া শিশুদের খেলনা, ঘরের তৈজসপত্র, আসবাবপত্র, বিভিন্ন ধরনের তৈরি পোশাক, মাটি ও বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রসহ নানা ধরনের পণ্যের স্টল নিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা।

মেলার আয়োজক ও নরসিংদী বাউল আঁখড়াধাময়ের সেবায়েত শ্রী শীর্ষেন্দু বাউল পিন্টু জানান, ৭০০ বছর আগে বাউল ঠাকুরে এখানে আবির্ভাব হয়েছিল। কিভাবে সহজে মানুষ নিজেকে চিনতে পারবে সেই পথ তিনি দেখিয়ে গেছেন। আমরা তার পথ অনুসরণ করে ভেদাভেদ বিভেদ না করে ঈশ্বরের সৃষ্টিকে ভালোবেসে যাচ্ছি। জাতীধর্ম নির্বিশেষে প্রতিবছর সকলের মিলন ঘটানোর জন্যই মেলার আয়োজন করে গেছে।