Joy Jugantor | online newspaper

অস্তিত্ব সংকটে বাঁশশিল্প দুর্দিনে শিল্পীরা

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২:২৫, ৬ জুলাই ২০২৪

অস্তিত্ব সংকটে বাঁশশিল্প দুর্দিনে শিল্পীরা

ছবি সংগৃহীত

কেউ তৈরি করছেন চাটাই, কেউ ডালি, কেউ কুলা আবার কেউ বানাচ্ছেন চালুন বা খেলনাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। কারো ক্লান্তি নেই। বিভিন্ন আকার ও শৈলীতে তৈরি হয় এসব পণ্য।

বর্থপালিগাঁও ও তাজপুর রাস্তার পাশের গ্রামটিতেই বাঁশশিল্পীদের বসবাস। বাঙালির নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত সাংসারিক সামগ্রী তৈরিতে নিপুণ শিল্পী এই গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা। যুগ যুগ ধরে এই গ্রামের পরিবারগুলোর নারী-পুরুষ বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তৈরিতে পারদর্শী। বাঁশের সাথে এসব পরিবারের মানুষের নাড়ির সম্পর্ক।

কিন্তু এই মানুষগুলোর ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না। প্লাস্টিক সামগ্রীর ভিড়ে একসময়ের ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে। প্রয়োজনীয় পুঁজি, সঠিক উদ্যোগের অভাব ও উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর নায্যমূল্য না থাকায় অনেকে পাল্টাচ্ছেন পেশা। 

দারিদ্র্যতাকে সঙ্গী করে পিতৃপুরুষের ঐতিহ্যবাহী পেশাকে এখনো যারা আগলে রেখেছেন, তারাও রয়েছেন নানা সমস্যায়। বাজারে প্রচলিত প্লাস্টিক সামগ্রীর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে তারা হয়ে পড়েছেন কোণঠাসা। ফলে আবহমান বাংলার এ শিল্পের ঐতিহ্য হারানোর পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জের বাঁশশিল্পীদের ভাগ্যে নেমে এসেছে দুর্দিন।

ঠাকুরগাঁও জেলাশহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে পীরগঞ্জ উপজেলার পল্লী বর্থপালিগাঁও তাজপুর। বর্থপালিগাঁও তাজপুরে ছোট একটি এলাকাজুড়ে তাদের বসতি। সেখানকার অধিকাংশ লোকজন হাঁড়ি বা বাঁশমালি নামে পরিচিত। সে গ্রামে না এলে হয়তো কোনোদিন জানা যেত না নতুন বাঁশের এক প্রকার সুগন্ধী থাকে। এই কাটা বাঁশের সুগন্ধ ও সোনালি রং পুরো গ্রামের পরিবেশকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। গ্রামের বাড়ির উঠানে কিংবা বাড়ির ওপর দিয়ে চলা মেঠোপথে অথবা বাড়ির পাশে ফাঁকা জায়গায় বসে বাঁশ দিয়ে নানা পণ্য তৈরি করছেন লোকজন। একাধিক বাসিন্দা জানালেন, সকালে অনেককে বের হতে হয় বাঁশ সংগ্রহে।

এর মধ্যে অন্যদের শুরু হয় বাঁশ কাটা, চাঁছা, চাটাই বাঁধা, শুকানো ও বিভিন্ন ধরনের উপকরণ তৈরির কাজ। সংসারের কাজ শেষ করে নারীরাও বসেন বাঁশের কাজে। ছেলেমেয়েরাও সাধ্যমতো সহযোগিতা করে। এভাবেই বয়ে যায় সকাল-সন্ধ্যা। বাঁশের কারিগর বলরাম রায় (৩০) জানালেন, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তিনি এ কাজ করেন। তবে প্লাস্টিকের বিভিন্ন জিনিসপত্র বাজারে পাওয়া যাওয়ায় বাঁশের জিনিস মানুষ কম কিনছেন।

বাড়ির উঠানে বসে কাজ করছিলেন কারিগর রাধীকা রানী (সাইকেল রানী ৩৩) তিনি জানালেন, আগে সহজে বাঁশ সংগ্রহ করা যেত। এখন বাঁশের সংকটসহ দাম বেড়েছে। সে কারণে লাভ কমে গেছে। কারিগর ললিয়া দাস (৫৫) জানান, বাঁশ কারিগরদের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের তৈরি পণ্য বাজারজাতকরণ। বর্তমানে তাদের তৈরি পণ্য বাজারজাত করতে স্থানীয়ভাবে পাইকার সৃষ্টি হয়েছে। আর তাদের কাছে এই বাঁশের শিল্পীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

এই স্থানীয় পাইকারদের কাছে আগাম টাকা নিয়ে বাঁশশিল্পীরা বাঁশ সংগ্রহ করে পণ্য তৈরি করেন। ফলে কম দামে ওই পাইকাররা এসব পণ্য ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করেন। যুগের পর যুগ এই বাঁশশিল্পীদের ভাগ্যের পরিবর্তন না হলেও তাদের এই শ্রম ও শৈল্পিক কাজের পুরো মুনাফা লুটে নিচ্ছেন ওই পাইকার গোষ্ঠী।