Joy Jugantor | online newspaper

শুধু ধুনটেই কমছে ৫৪০০ টন টমেটোর উৎপাদন

খালিদ বিন সাঈদ

প্রকাশিত: ১৫:০২, ১২ অক্টোবর ২০২১

শুধু ধুনটেই কমছে ৫৪০০ টন টমেটোর উৎপাদন

জমিতে ওষুধ দিচ্ছেন কৃষক। ধুনটের চৌকিবাড়ী থেকে তোলা ছবি

এ বছর প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন টমেটো কম উৎপাদন হবে বগুড়ার ধুনট উপজেলায়। গেল বছরের করোনার প্রকোপে লোকসান দেখা দেয়ায় এ উপজেলায় টমেটো কম চাষ হচ্ছে। 

এ কারনে অনেক কৃষক টমেটো সবজি চাষের বদলে অন্য ফসল আবাদ করছেন। অনেকে গতবারের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আবার টমেটো চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তবে সেখানেও বাঁধ সেধেছে রোগের সংক্রমণ। 

কৃষকরা জানান, ধুনট উপজেলা থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ টমেটো দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এবার কচি চারা গাছে রোগের সংক্রমণ হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।

টমেটো গাছে পাতা কোঁকড়ানো রোগে ধরেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা মহামারিতে গতবার টমেটোতে লোকসান হওয়ায় এবার প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে টমেটো আবাদ কম হয়েছে। এ ছাড়া মৌসুমের শুরুতে তাপমাত্রা বেশি থাকা এবং রোগের সংক্রমণে টমেটোর চারা গাছে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। 

স্থানীয় সূত্র জানায়, বগুড়ার ধুনট উপজেলায় আগাম জাতের টমেটো চাষের জন্য সুখ্যাতি রয়েছে। ধুনট পৌর এলাকা, চৌকিবাড়ী, এলাঙ্গী, মথুরাপুর, গোপালনগর এলাকায় টমেটো সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়। এখান থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আগাম টমেটো দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। এতে বড় অংকের টাকাও আয় করেন উপজেলার চাষীরা।  

ধুনট উপজেলা কৃষি অফিসের পরিসংখ্যানে জানা যায়, গতবছর উপজেলায় প্রায় ৪১০ হেক্টর জমি টমেটো চাষের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জন হয়েছিল ৩৫৫ হেক্টর। এই পরিমাণ জমিতে উৎপাদন পাওয়া যায় প্রায় ২১ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। চলতি বছরে উপজেলায় টমেটো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩৫৫ হেক্টর। এর বিপরীতে অর্জন হয় ২৬৫ হেক্টর। এর মধ্যে আগাম জাতের টমেটো চাষ করা হয় ১২০ হেক্টর জমিতে। 

প্রতি হেক্টর জমিতে টমেটো উৎপাদন হয় প্রায় ৬০ মেট্রিক টন। এ হিসাবে এ বছর প্রায় ৫ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন টমেটো কম উৎপাদন হবে ধুনট উপজেলায়।

কৃষি অফিস সূত্র জানায়, করোনার প্রকোপ এ বছর কম পরিমাণ জমিতে এই টমেটো চাষ হওয়ার প্রথম কারন। গতবছর মহামারীর জন্য টমেটো বিক্রি করতে পারেননি অধিকাংশ কৃষক। আবার দামও ছিল কম। এ ছাড়া গত মৌসুমে বোরো ধানের ফলন ও মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকে টমেটোর বদলে জমিতে ধানের চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। 

স্থানীয় কৃষকরা বলেন, টমেটো ফলন ভালো হলে অন্য ফসলের তুলনায় মুনাফা বেশি থাকে। এর মধ্যে আগাম টমেটোর চাহিদা অনেক বেশি থাকে এবং দাম ভালো পাওয়া যায়। আবার এই আগাম টমেটোর শেষে একই জমিতে সরিষার চাষ করা যায়। সরিষা শেষে ওই জমিতে বোরো চাষ হয়।

কিন্তু এবার মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি কম থাকায় প্রায় জমিতে টমেটো গাছে রোগ বালাই দেখা যায়। এতে করে কৃষকদের চোখে মুখে হতাশার ছাপ পড়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, কাধেঁ স্প্রে মেশিন নিয়ে জমির এ পাশ থেকে ওপাশ বা কেউ নিড়ানি নিয়ে জমিতে ব্যস্ত আগাছা পরিষ্কার করতে। কোন কোন গাছে উঁকি দিচ্ছে টমেটোর ফুল। হালকা কুয়াশায় ভেজা সকাল থেকে গাছে পানি দেওয়া শুরু হয়। খাঁ খাঁ রোদের দুপুর পেরিয়ে গোধূলি লগ্নে গিয়েও কৃষকরা আগাছা পরিষ্কারসহ বিভিন্নভাবে জমির যত্ন নিচ্ছেন। 

তবে উপজেলার বেশিরভাগ জমির টমেটো গাছের পাতা কুঁকড়ে গেছে। অনেক জমিতে পোকা লেগে পাতা মরে যাচ্ছে। ফুল ও পাতা ঝরে না পড়ার জন্য কৃষকরা তাই জমিতে ওষুধসহ নানা প্রকার কিটনাশক ছিটাচ্ছেন। এভাবে কারও কারও জমিতে ওষুধ কাজ করছে। অনেকের জমির টমেটো গাছ মরে গেছে।

টমেটো গাছে ফুল আসা শুরু হয়েছে।

উপজেলার চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের কৃষক মনু বক্স গত বছর সাড়ে ৪ বিঘা জমিতে টমেটোর চাষ করেন। করোনার প্রকোপ আর রোগ বালায়ের জন্য ফলন ও দাম কোনটায় আশানুরূপ পাননি তিনি। তার হিসাবে গতবার প্রায় লাখ টাকার বেশি লোকসান গুনতে হয়েছে।

মনু বক্স বলেন, ওই লোকসানের পর এবার ৩ বিঘা জমিতে আপেল জাতের টমেটোর চাষ করেছি। গাছে মাত্র ফুল আসা শুরু হয়েছে। কিন্তু জমির অধিকাংশ গাছের পাতা কোঁকড়ানো রোগ ধরেছে। এ জন্য আবার লোকসানের শঙ্কায় আছি।

একই এলাকার আসমত আরেক কৃষক নিড়ানি দিয়ে টমেটোর জমির আগাছা পরিষ্কার করছিলেন। তিনিও করোনার কারনে লোকসানে পড়েছেন। আসমত জানান, গতবার তিন বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছিলেন। এই পরিমাণ জমিতে চাষ করতে ৮৫ থেকে ৯০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। টমেটোর ফলনও ভালো ছিলো। কিন্তু দাম না থাকায় কোন রকম খরচ তুলতে পেরেছিলেন।

এ জন্য এবার দেড় বিঘা জমিতে টমেটোর আবাদ করেছেন। বাকি জমিতে ধানের চাষ করেছেন আসমত।

মুথরাপুর ইউনিয়নের কৃষক জমশের মোল্লা বলেন, দুই বিঘা জমিতে টমেটো লাগিয়েছেন। কয়েকদিন ধরে গাছের পাতা কুঁকড়ে যাওয়া রোগের সংক্রমণ হওয়ায় চিন্তায় আছি। তিনি জানান, এ জন্য সারাদিন জমিতে টমেটোর গাছের যত্নে সারাদিন ব্যয় করছেন। যাতে গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে পারেন।

 

জমিতে গাছের যত্ন নিচ্ছেন কৃষক।

উপজেলার আলমগীর, শমসের আলীসহ আরও অনন্ত ১০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, এবার অনেক চাষী টমেটোর আবাদ করছেন না। তারা বেশিরভাগই ধান চাষ করেছেন।  

উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আসাদুজ্জামান জানান, গত মাসে তাপমাত্রা বেশি থাকার কারনে টমেটো গাছে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। এখন আবহাওয়া ভালো। এ জন্য গতবারের তুলনায় ভালো ফলন হবে বলে আমরা আশাবাদী। আর আগাম জাতের টমেটোর বাজার মূল্য সন্তোষজনক হবে। 

আর বেশ কিছু স্থানে টমেটোর জমিতে শোষক পোকার সংক্রমণ হয়েছে। লিকার প্রজাতির ওষুধ সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করলে এ সমস্যা দূর হয়ে যাবে বলে জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।