Joy Jugantor | online newspaper

ঘাস চাষ বদলে দিল কৃষকের ভাগ্য

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ২২:৫৫, ৩১ মার্চ ২০২১

ঘাস চাষ বদলে দিল কৃষকের ভাগ্য

২০ বছর আগে এই ঘাসের আবাদ শুরু করেন গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার সুলতানপুর বাড়াইপাড়া গ্রামের আব্দুল গফ

শুধু ঘাস বদলে দিয়েছে একটি গ্রামের মানুষদের ভাগ্য। গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরবাড়ী ইউনিয়নের সুলতানপুর বাড়াইপাড়া গ্রামে এমনি ঘটনা ঘটেছে। ঘাস চাষ করে নিজেদের অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়েছেন তারা।

গ্রামের কৃষকরা জানান, এখানকার ২০০ জন কৃষকের মধ্যে ১৫০ জনই চাষ করেন ঘাস। আর এই ঘাস চাষের মাধ্যমেই বদলে যাচ্ছে এলাকার কৃষকদের আর্থ সামাজিক অবস্থা। 

সুলতানপুর বাড়াইপাড়া, প্রজাপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বাড়ির উঠান, বাড়ির পিছনে পরিত্যক্ত জমিতে কৃষকরা লাগিয়েছেন নেপিয়ার জাতের ঘাস।

শুরুর গল্পটা জানতে চাইলে কৃষকরা জানান, ১৮ থেকে ২০ বছর আগে সুলতানপুর বাড়াই গ্রামের আব্দুল গফুর (৫৫) প্রথমে এই ঘাস চাষ করেসফলতা পান। তার দেখাদেখি অন্য কৃষকরা ঘাস চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে থাকেন। 

আস্তে আস্তে ঘাস ছড়িয়ে পরে উপজেলার ৩০-৪০টি গ্রামে। শুধু তাই নয়, পুরো গাইবান্ধা জেলার সাতটি উপজেলার হাজারো কৃষক এখন চাষ করছেন গবাদিপশুর খাদ্য নেপিয়ার ঘাস।

কথা হয় সেই আবদুল গফুরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘২০ বছর আগে আমি ছিলাম একজন হতদরিদ্র দিনমজুর। ছয় সদস্যের সংসার ছিল ক্ষুধা-দারিদ্র ও ঋণ। ওই সময় গ্রামের এক স্কুলশিক্ষক আমাকে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পরের দিন আমি তাই করলাম।’

‘উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আমাকে কিছু নেপিয়ার ঘাসের চারা দিয়ে চাষ করতে বলেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ঘাস চাষ করলে কী হবে? তিনি বলেছিলেন- এটা তোমার ভাগ্যের পরিবর্তন করবে।’

‘এরপর থেকে আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি,’ বলেন আব্দুল গফুর।

গফুর জানান, শুধু ঘাস চাষ এবং গরু পালন করে গত ১০-১২ বছরে জমি কিনেছেন আট বিঘা। যার সেই সময়ের বাজার মূল্য ছিল প্রায় ৮০ লাখ টাকা। এ ছাড়া আরও ৮-১০ লাখ টাকা দিয়ে তিন ছেলেকে একটি আধা-পাকা ঘর তৈরি করে দিয়েছেন বলে জানান।

তিন ছেলেকে নিয়ে এখনো ২০ বিঘার মতো জমিতে ঘাস চাষ করেন আব্দুল গফুর। নেপিয়ার এবং সুপার নেপিয়ার-পাঞ্চচোগ-১ (হাইব্রিড) জাতের ঘাস চাষ করছেন তারা।

তবে ২০০০ সালের দিকে আব্দুল গফুর যখন ঘাস চাষ শুরু করেন তখন গ্রামের লোক তার সমালোচনা করতে শুরু করেন। এমনকি তার নাম বদলে রাখা হয় ‘ঘাস গফুর’।

আব্দুল গফুরের ছেলে ফারুক হাসান (২৮) বলেন, ‘এলাকার হাজার হাজার কৃষক আমার বাবার সাফল্য অনুসরণ করছেন এবং তাদের দারিদ্র্য দূর করার জন্য ঘাস চাষ করছেন।’

ফারুক জানান, আগে এই এলাকার দরিদ্র মানুষের খুব বেশি কাজ ছিল না। বেকার বসে থাকতেন তারা। তবে এখন এলাকার অনেক কৃষক যারা কাজের সন্ধানে গার্মেন্টসে গিয়েছিল, তারা বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন এবং ঘাস চাষ করে নিজের দারিদ্রতা দূর করছেন।’

আশেপাশের গ্রামের প্রায় ৩০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা হলো, যারা সবাই এখন ঘাস চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং এলাকায় ঘাস চাষের প্রচলন করার জন্য আব্দুল গফুরের প্রশংসা করেছেন।

তার সাফল্য অনুসরণ করে সুলতানপুর বড়াইপাড়া ও সংলগ্ন প্রজাপাড়া, দিঘলকান্দি, বড় শিমুলতলা, কাছারিপাড়া, আশমতপুর, লোকমানপুর, কিশোরগাড়ি, কাসিয়াবাড়ী, কাতুলি এবং বেনগুলিয়া গ্রামের কয়েক হাজার কৃষক এখন ঘাস চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা।

ঘাষচাষীরা বলেন, অন্য যে কোনো ফসলের তুলনায় ঘাসের চাষ কম ব্যয়বহুল। কোনো কীটনাশক লাগে না। জমিতে সেচ কম লাগে। একবার কোনো জমিতে ঘাস লাগালে পরের টানা তিন বছর ধরে ফসল পাওয়া যায়। যদি এক বিঘা জমিতে নেপিয়ার চাষ করা যায় তবে প্রতি মাসে সেখান থেকে ঘাস কাটা যায়। এক বিঘা জমি থেকে ৩ হাজার আটি (৫-৬ কেজি ওজনের) ঘাস কাটা যায়, যার বর্তমান বাজার মূল্য ২০-৩০ হাজার টাকা (প্রতি আটি ৮-১০ টাকা)। এক বছরে এইভাবে একই জমি থেকে ৭-৮ বার ঘাস কাটা যায়। প্রতি বিঘা জমিতে বছরে খরচ হয় ৩০-৪০ হাজার টাকা আর লাভ হয় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা।’

কৃষকদের কাছে থেকে জানা যায়, এলাকায় কৃষকদের মধ্যে রাসায়নিক সার ব্যবহারের প্রবণতা অনেক কমেছে। কারণ প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে গরু থাকায় তাদের গোবর সারের অভাব হয় না। 

সুলতানপুর বড়াইপাড়া গ্রামের কৃষক মো. জহুরুল ইসলাম (৪২) বলেন, ‘দশ বছর আগে তামাক এই এলাকার প্রধান ফসল ছিল, কিন্তু ঘাস তামাক চাষের জায়গা দখল করে নিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে এখানে তুলা, কলা, মরিচ, টমেটোসহ শাকসবজির আধিপত্য ছিল। এখন নেপিয়ারই সুলতানপুর এবং প্রজাপাড়া গ্রামের প্রধান ফসল।’

আসমতপুর গ্রামের আরেক কৃষক আবদুল জলিল (৩২) বলেন, ‘এমন কোনো ফসল নেই যা চাষ করলে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না, কিন্তু নেপিয়ার ঘাসই একমাত্র ফসল যা চাষ করলে কখনো ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি। আমি এক বিঘা জমিতে ঘাস লাগিয়ে মাসে ২০ হাজার টাকা লাভ করছি।’

প্রজাপাড়া গ্রামের কৃষক জাফর আহমেদ বলেন, ‘আমাদের গ্রামের ৫০-৬০ জন কৃষক প্রতিদিন সকালে ভ্যানে করে ঘাস নিয়ে গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, বগুড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাট-বাজারে নিয়ে যায় বিক্রির জন্য। আমাদের কষ্ট কমেছে। সবার ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে।’

‘গতবছরে কয়েকদফা বন্যায় খড়ের খুব অভাব দেখা দেয়। তখন এই ঘাস আমাদের গবাদি পশুদের রক্ষা করেছে। আবার বিক্রি করেও লাভবান হয়েছি আমরা জানান আরেক কৃষক সুরুজ মিয়া (৫০)।

পলাশবাড়ী উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আলতাব হোসেন এলাকার কৃষকদের উন্নতি স্বীকার করে বলেন, ‘গত ১০ বছরে এই এলাকায় নেপিয়ার ঘাস চাষ বেড়েই চলছে। জেলার মোট ঘাসের ৪০ শতাংশ এই উপজেলায় চাষ হয়। এমনকি এই ঘাস চাষের ফলে কমেছে ক্ষতিকর তামাক চাষ।’

গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাছুদার রহমান সরকার বলেন, ‘জেলায় এখন মোট ঘাসের আবাদি পরিমাণ ৩৭৩ হেক্টর। আস্তে আস্তে সারা জেলায় ঘাস চাষের পরিমাণ বাড়ছে। এমনকি যাদের নিজের জমি নেই তারা রাস্তার দুই পাশেও ঘাসের চাষ করছেন।’

ঘাস চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করার জন্য আব্দুল গফুর বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক পেয়েছেন ২০১৪ সালে। তবে আব্দুল গফুরের অভিযোগ, ‘স্থানীয় কৃষি অধিদপ্তর ঘাস চাষে কৃষকদের কোন রকম পরামর্শ বা প্রশিক্ষণ দেয় না।’

জানতে চাইলে পলাশবাড়ী উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘আসলে ঘাস কোনো ফসল নয়, তাই এই বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য সরকারি কোনো বরাদ্দ আসে না। বিষয়টি দেখে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস।’
সৌজন্যে: দ্য ডেইলি স্টার